ঢাকা ০৮:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আন্দিউড়ায় জশনে জুলুস ও বর্ণাঢ্য র‍্যালি Logo ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভাইয়ের জমি দখলের অভিযোগ, লাখাইয়ে হামলায় বৃদ্ধ বাবাসহ আহত ৩ Logo ঢাকায় চালু হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার ভিসা আবেদন কেন্দ্র, ২ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন নিয়ম Logo মাধবপুরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ঈদে মিলাদুন্নবী ও বর্ণাঢ্য জশনে জুলুস Logo চৌমুহনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আলোচনা ও দোয়া মাহফিল Logo মাধবপুরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের ঈদে মিলাদুন্নবী ও বর্ণাঢ্য জশনে জুলুস Logo ধুলিয়াখাল-মিরপুর সড়কে টমটম-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে যুবক নিহত Logo মাধবপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কাপড়ের দোকান পুড়ে ছাই, ক্ষতি ২৫ লাখ টাকার বেশি Logo শিমুলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত Logo মাধবপুরে খান্দুরা শরীফের উদ্যোগে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে জশনে জুলুস

কালের সাক্ষী লাখাইয়ের মোড়াকরি রাস বিহারী সাহার জমিদার বাড়ি, সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের পথে ঐতিহ্য

পারভেজ হাসান, লাখাই উপজেলা প্রতিনিধি:
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ঐতিহাসিক মোড়াকরি গ্রামে অবস্থিত শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী রাস বিহারী সাহার জমিদার বাড়ি এখন সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের পথে। স্থানীয়ভাবে ‘রাস বিহারী সাহার বাড়ি’ বা ‘রাস বিহারী বাড়ি’ নামে পরিচিত এই প্রাচীন স্থাপনাটি একসময় এলাকার ঐতিহ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। কালের পরিক্রমায় এর জৌলুস হারিয়ে গেলেও প্রাচীন ইট-পাথরের অবকাঠামো আজও অতীত ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে।
ঐতিহাসিক বলভদ্র নদীর তীরে গড়ে ওঠা মোড়াকরি গ্রাম একসময় সমৃদ্ধ ও বিত্তশালী জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। স্থানীয় ইতিহাসচর্চা ও বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, আনুমানিক অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ কিংবা ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এ জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন হয়। বাড়িটির প্রতিষ্ঠাতা রাস বিহারী সাহা ছিলেন তৎকালীন সময়ের একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মহাজন। তাঁর উদ্যোগ ও নেতৃত্বে মোড়াকরি অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।
রাস বিহারী সাহার সময়েই বিশাল প্রাসাদ চত্বরের পাশাপাশি একটি দৃষ্টিনন্দন নাটমন্দির বা দুর্গাপূজা মণ্ডপ নির্মিত হয়। বাড়িটির স্থাপত্যশৈলীতে তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভাবের ছাপ দেখা যায়। বিশেষ করে মূল প্রবেশ তোরণের বিশাল খিলান ও কারুকাজ এখনও অনেকাংশে টিকে আছে। তোরণ ও দেয়ালের বিভিন্ন অংশে থাকা পোড়ামাটির সূক্ষ্ম অলংকরণ সেকালের দক্ষ কারিগরদের শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় বহন করছে।
জমিদার বাড়ি সংলগ্ন বিশাল পুকুর এবং সানবাঁধানো ঘাটও একসময় এ প্রাসাদের কর্মব্যস্ত ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের অংশ ছিল। স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, বিভিন্ন পূজা-পার্বণ ও উৎসব উপলক্ষে নাটমন্দিরে দুর্গোৎসব ও রাস উৎসবের বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হতো। এসব উৎসব উপভোগ করতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে সমবেত হতেন।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জমিদার পরিবারের প্রভাব ও এই প্রাসাদের জৌলুসও হারিয়ে যেতে থাকে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সাহা পরিবারের সদস্যরা ভারত চলে যান। এরপর থেকেই বিশাল এ জমিদার সম্পত্তি ধীরে ধীরে অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে থাকে। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি এবং দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
প্রাসাদের অনেক দেয়ালে এখন বট ও অশ্বত্থ গাছের শেকড় বিস্তার করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়েছে এবং কিছু জায়গা বেদখল হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ও সংস্কার না হওয়ায় প্রতিদিনই হারিয়ে যাচ্ছে এ ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রাচীন রূপ।
তারপরও লাখাইয়ের অতীত ইতিহাসের সাক্ষী এই জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখতে এবং ক্যামেরাবন্দি করতে বিভিন্ন স্থান থেকে ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক ও দর্শনার্থীরা আসেন। স্থানীয় সংস্কৃতিমনা মানুষ ও সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে স্থাপনাটি সংরক্ষণ করা হলে এটি লাখাইয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাদের মতে, প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব যাচাই করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের মাধ্যমে রাস বিহারী সাহার জমিদার বাড়িটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে এ অঞ্চলের গৌরবোজ্জ্বল অতীত তুলে ধরা যাবে। পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে সংস্কার ও পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হলে এটি সম্ভাবনাময় একটি দর্শনীয় স্থানেও পরিণত হতে পারে।
স্থানীয়দের এখন একটাই প্রত্যাশা—অবহেলা ও প্রকৃতির ক্ষয়ের হাত থেকে মোড়াকরির এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক। অন্যথায় সময়ের প্রবল স্রোতে লাখাইয়ের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শন একসময় চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

আপলোডকারীর তথ্য

বাংলার খবর

জনপ্রিয় সংবাদ

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আন্দিউড়ায় জশনে জুলুস ও বর্ণাঢ্য র‍্যালি

error:

কালের সাক্ষী লাখাইয়ের মোড়াকরি রাস বিহারী সাহার জমিদার বাড়ি, সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের পথে ঐতিহ্য

আপডেট সময় ০১:৫৫:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

পারভেজ হাসান, লাখাই উপজেলা প্রতিনিধি:
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ঐতিহাসিক মোড়াকরি গ্রামে অবস্থিত শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী রাস বিহারী সাহার জমিদার বাড়ি এখন সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের পথে। স্থানীয়ভাবে ‘রাস বিহারী সাহার বাড়ি’ বা ‘রাস বিহারী বাড়ি’ নামে পরিচিত এই প্রাচীন স্থাপনাটি একসময় এলাকার ঐতিহ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। কালের পরিক্রমায় এর জৌলুস হারিয়ে গেলেও প্রাচীন ইট-পাথরের অবকাঠামো আজও অতীত ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে।
ঐতিহাসিক বলভদ্র নদীর তীরে গড়ে ওঠা মোড়াকরি গ্রাম একসময় সমৃদ্ধ ও বিত্তশালী জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। স্থানীয় ইতিহাসচর্চা ও বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, আনুমানিক অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ কিংবা ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এ জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন হয়। বাড়িটির প্রতিষ্ঠাতা রাস বিহারী সাহা ছিলেন তৎকালীন সময়ের একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মহাজন। তাঁর উদ্যোগ ও নেতৃত্বে মোড়াকরি অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।
রাস বিহারী সাহার সময়েই বিশাল প্রাসাদ চত্বরের পাশাপাশি একটি দৃষ্টিনন্দন নাটমন্দির বা দুর্গাপূজা মণ্ডপ নির্মিত হয়। বাড়িটির স্থাপত্যশৈলীতে তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভাবের ছাপ দেখা যায়। বিশেষ করে মূল প্রবেশ তোরণের বিশাল খিলান ও কারুকাজ এখনও অনেকাংশে টিকে আছে। তোরণ ও দেয়ালের বিভিন্ন অংশে থাকা পোড়ামাটির সূক্ষ্ম অলংকরণ সেকালের দক্ষ কারিগরদের শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় বহন করছে।
জমিদার বাড়ি সংলগ্ন বিশাল পুকুর এবং সানবাঁধানো ঘাটও একসময় এ প্রাসাদের কর্মব্যস্ত ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের অংশ ছিল। স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, বিভিন্ন পূজা-পার্বণ ও উৎসব উপলক্ষে নাটমন্দিরে দুর্গোৎসব ও রাস উৎসবের বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হতো। এসব উৎসব উপভোগ করতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে সমবেত হতেন।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জমিদার পরিবারের প্রভাব ও এই প্রাসাদের জৌলুসও হারিয়ে যেতে থাকে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সাহা পরিবারের সদস্যরা ভারত চলে যান। এরপর থেকেই বিশাল এ জমিদার সম্পত্তি ধীরে ধীরে অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে থাকে। জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি এবং দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
প্রাসাদের অনেক দেয়ালে এখন বট ও অশ্বত্থ গাছের শেকড় বিস্তার করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়েছে এবং কিছু জায়গা বেদখল হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ও সংস্কার না হওয়ায় প্রতিদিনই হারিয়ে যাচ্ছে এ ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রাচীন রূপ।
তারপরও লাখাইয়ের অতীত ইতিহাসের সাক্ষী এই জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখতে এবং ক্যামেরাবন্দি করতে বিভিন্ন স্থান থেকে ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক ও দর্শনার্থীরা আসেন। স্থানীয় সংস্কৃতিমনা মানুষ ও সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে স্থাপনাটি সংরক্ষণ করা হলে এটি লাখাইয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাদের মতে, প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব যাচাই করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের মাধ্যমে রাস বিহারী সাহার জমিদার বাড়িটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে এ অঞ্চলের গৌরবোজ্জ্বল অতীত তুলে ধরা যাবে। পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে সংস্কার ও পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হলে এটি সম্ভাবনাময় একটি দর্শনীয় স্থানেও পরিণত হতে পারে।
স্থানীয়দের এখন একটাই প্রত্যাশা—অবহেলা ও প্রকৃতির ক্ষয়ের হাত থেকে মোড়াকরির এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক। অন্যথায় সময়ের প্রবল স্রোতে লাখাইয়ের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শন একসময় চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।