ঢাকা ০৯:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo লাখাই মুক্তিযোদ্ধা ডিগ্রি কলেজের বেহাল সড়ক, চরম ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা Logo মাধবপুরে অবৈধ বালু পরিবহনের অভিযোগে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা Logo শাহজাহানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে এক কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ভবনের নির্মাণকাজ উদ্বোধন Logo লাখাইয়ের বুল্লা বাজারে নৈশ চুরির হিড়িক, কয়েকদিনে দফায় দফায় চুরি Logo মাহাথির মোহাম্মদের স্ত্রী সিতি হাসমাহ আর নেই, বয়স হয়েছিল ১০০ বছর Logo মাধবপুরে ৫ কেজি গাঁজাসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যুবক আটক Logo চুনারুঘাট-মাধবপুর সীমান্তে ৭ লাখ ২৯ হাজার টাকার গরু-মদ জব্দ Logo মাধবপুরে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ Logo হাইমচরে কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশের অভিযান, আটক ৪৮ Logo জানুয়ারিতে সংসদে উঠতে পারে সংবিধান সংশোধন বিল, পাসের পর গণভোট

গণহারে আসামি করার সংস্কৃতি: ন্যায়বিচারের পথে বড় অন্তরায়

পারভেজ হাসান, লাখাই:

বাংলাদেশে বিচারপ্রার্থী মানুষের মধ্যে বর্তমানে একটি আত্মঘাতী প্রবণতা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোনো একটি অপরাধ বা পারিবারিক কিংবা সামাজিক বিরোধ ঘটলেই অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মামলার বাদীপক্ষ প্রকৃত অপরাধীর পাশাপাশি তার পুরো পরিবার বা গোষ্ঠীকেই আসামি করে ফেলছে। এই ‘গণহারে আসামি’ করার সংস্কৃতি আমাদের বিচারব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বর্তমানে মামলা কেবল অপরাধের বিচার পাওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে হেয় করা ও হয়রানি করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্যক্তিগত বিরোধ বা প্রতিশোধের মনোভাব থেকে এমন সব ব্যক্তিকেও মামলায় জড়ানো হচ্ছে, যারা ঘটনার সময় এলাকায় ছিলেন না, কর্মসূত্রে দূরে অবস্থান করছিলেন কিংবা প্রবাসে রয়েছেন। উদ্দেশ্য থাকে একটাই—আইনি জটিলতায় ফেলে পুরো পরিবারকে চাপে রাখা।

একটি সাধারণ ঘটনায় যখন ২০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত আসামি করা হয়, তখন পুলিশের জন্য প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এজাহারে একাধিক মিথ্যা ও অপ্রাসঙ্গিক নাম যুক্ত থাকলে তদন্ত প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জন্য সত্য-মিথ্যা আলাদা করা জটিল হয়ে ওঠে, ফলে চার্জশিট প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে।

আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—দশজন অপরাধী মুক্তি পেলেও যেন একজন নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি না পায়। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে যখন নিরপরাধ মানুষকে মামলায় জড়ানো হয়, তখন মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়। এর সুযোগ নেয় প্রকৃত অপরাধীরা। প্রমাণের অভাবে অনেক সময় মূল অপরাধীরাও খালাস পেয়ে যায়। ফলে বাদীপক্ষ নিজের অজান্তেই নিজের ন্যায়বিচারের পথকে সংকুচিত করে ফেলে।

বিচারের নামে এই অবিচারের চর্চা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারব্যবস্থা ও আইনের প্রতি গভীর অনাস্থা তৈরি করছে। অপরাধ না করেও যখন কাউকে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয়, তখন আইনের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অনাস্থা সমাজে অস্থিরতা ও হতাশা বাড়িয়ে তোলে।

আমরা যদি নিজেরাই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বিচার চাই, তবে কখনোই প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। মিথ্যা মামলায় নিরপরাধ মানুষকে জড়ানো শুধু অনৈতিক নয়, এটি ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা। ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে আইনের অপব্যবহার বন্ধ করা জরুরি। সুষ্ঠু তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং নিরপরাধ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত হলেই কেবল সমাজে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা—আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হোক, যাতে নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার না হয় এবং প্রকৃত অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনই হওয়া উচিত আমাদের সবার লক্ষ্য।

আপলোডকারীর তথ্য

বাংলার খবর

জনপ্রিয় সংবাদ

লাখাই মুক্তিযোদ্ধা ডিগ্রি কলেজের বেহাল সড়ক, চরম ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা

error:

গণহারে আসামি করার সংস্কৃতি: ন্যায়বিচারের পথে বড় অন্তরায়

আপডেট সময় ১১:২৩:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পারভেজ হাসান, লাখাই:

বাংলাদেশে বিচারপ্রার্থী মানুষের মধ্যে বর্তমানে একটি আত্মঘাতী প্রবণতা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কোনো একটি অপরাধ বা পারিবারিক কিংবা সামাজিক বিরোধ ঘটলেই অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মামলার বাদীপক্ষ প্রকৃত অপরাধীর পাশাপাশি তার পুরো পরিবার বা গোষ্ঠীকেই আসামি করে ফেলছে। এই ‘গণহারে আসামি’ করার সংস্কৃতি আমাদের বিচারব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বর্তমানে মামলা কেবল অপরাধের বিচার পাওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে হেয় করা ও হয়রানি করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্যক্তিগত বিরোধ বা প্রতিশোধের মনোভাব থেকে এমন সব ব্যক্তিকেও মামলায় জড়ানো হচ্ছে, যারা ঘটনার সময় এলাকায় ছিলেন না, কর্মসূত্রে দূরে অবস্থান করছিলেন কিংবা প্রবাসে রয়েছেন। উদ্দেশ্য থাকে একটাই—আইনি জটিলতায় ফেলে পুরো পরিবারকে চাপে রাখা।

একটি সাধারণ ঘটনায় যখন ২০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত আসামি করা হয়, তখন পুলিশের জন্য প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এজাহারে একাধিক মিথ্যা ও অপ্রাসঙ্গিক নাম যুক্ত থাকলে তদন্ত প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায়। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জন্য সত্য-মিথ্যা আলাদা করা জটিল হয়ে ওঠে, ফলে চার্জশিট প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে।

আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—দশজন অপরাধী মুক্তি পেলেও যেন একজন নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি না পায়। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে যখন নিরপরাধ মানুষকে মামলায় জড়ানো হয়, তখন মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়। এর সুযোগ নেয় প্রকৃত অপরাধীরা। প্রমাণের অভাবে অনেক সময় মূল অপরাধীরাও খালাস পেয়ে যায়। ফলে বাদীপক্ষ নিজের অজান্তেই নিজের ন্যায়বিচারের পথকে সংকুচিত করে ফেলে।

বিচারের নামে এই অবিচারের চর্চা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচারব্যবস্থা ও আইনের প্রতি গভীর অনাস্থা তৈরি করছে। অপরাধ না করেও যখন কাউকে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হয়, তখন আইনের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অনাস্থা সমাজে অস্থিরতা ও হতাশা বাড়িয়ে তোলে।

আমরা যদি নিজেরাই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বিচার চাই, তবে কখনোই প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। মিথ্যা মামলায় নিরপরাধ মানুষকে জড়ানো শুধু অনৈতিক নয়, এটি ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা। ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে আইনের অপব্যবহার বন্ধ করা জরুরি। সুষ্ঠু তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং নিরপরাধ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত হলেই কেবল সমাজে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা—আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা হোক, যাতে নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার না হয় এবং প্রকৃত অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনই হওয়া উচিত আমাদের সবার লক্ষ্য।