
মোঃ আইয়ুব খান: মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি
দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি) বর্তমানে গভীর আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। টানা লোকসান, ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজার সংকোচনের কারণে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হবিগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলের জগদীশপুর, তেলিয়াপাড়া, চন্ডিছড়া, পারকুল, মাধবপুর, প্রেমনগর, বিজয়া, পাত্রখোলা, চাম্পারাই, মদনমোহনপুর ও লাক্কাতুরাসহ ১২টি চা বাগান নিয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটি একসময় দেশের চা শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বর্তমানে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
সম্প্রতি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান আর্টিজান চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের প্রতিবেদনে কোম্পানিটির আর্থিক দুরবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে লোকসানে রয়েছে এনটিসি। ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩৯ কোটি ৯ লাখ টাকা। একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৪৪৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা। শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) ঋণাত্মক ১৪৪ দশমিক ৯৭ টাকায় নেমে গেছে, যা কোম্পানির আর্থিক অবস্থার গভীর সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়।
চা বাগান সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে শ্রমিকদের মজুরি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সার, কীটনাশক, যন্ত্রপাতি ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চায়ের বাজারমূল্য বাড়েনি। ফলে উৎপাদিত প্রতি কেজি চা থেকে আগের মতো লাভ করা সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদিত চা চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে নিয়ে বিক্রি করতে হওয়ায় পরিবহন ও গুদামজাত ব্যয়ও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের অবস্থান এখনও সীমিত। ফলে রপ্তানি সম্ভাবনা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে না। মৌসুমের শুরুতে চায়ের দাম কিছুটা ভালো থাকলেও পরে তা কমে যায়, যা উৎপাদকদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করে।
চন্ডিছড়া চা বাগানে ন্যাশনাল টি কোম্পানি উৎপাদিত চায়ের প্রায় ২৫ শতাংশ নিজস্ব ব্র্যান্ডে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করছে। তবে শক্তিশালী বিপণন নেটওয়ার্ক ও আধুনিক বিপণন কৌশলের অভাবে এ খাতে প্রত্যাশিত সাফল্য আসছে না। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিপণন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা গেলে বিক্রি বাড়ানো সম্ভব। বিপণন বিভাগের লোকজন কাজে আন্তরিক নন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে চলতি বছর অতিবৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চা উৎপাদনও কমে গেছে। অনেক বাগানে পাতা সংগ্রহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে চলতি অর্থবছরে লোকসান আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও চা শিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এনটিসির ১২টি চা বাগানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক ও কর্মচারী জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে পড়ে কার্যক্রম সংকুচিত বা বন্ধ হয়ে গেলে হাজারো শ্রমিক পরিবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। চা বাগানকেন্দ্রিক স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ পুনঃতফসিল, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বিপণন সম্প্রসারণ, রপ্তানি বাজার বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে সরকার সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা দিলে চা বাগানগুলো পুনরায় লাভজনক হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এ বিষয়ে এনটিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হাসান বলেন, “সব বাগানে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং চায়ের গুণগত মান উন্নয়নে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা আশাবাদী, ধীরে ধীরে লোকসান কমিয়ে এনটিসির বাগানগুলোকে আবারও সোনালি সময়ে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হব।
বাংলার খবর ডেস্ক : 























