
হবিগঞ্জে ভয়াবহ গ্যাস সংকটে ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চাহিদার তুলনায় কম গ্যাস সরবরাহের পর বুধবার (১২ আগস্ট) থেকে জেলার অধিকাংশ শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে কারখানার উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে অর্ডার বাতিল হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাধবপুরের যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে ছয়টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে টায়ার ও পাওয়ার প্ল্যান্ট ছাড়া বাকি চারটি প্রতিষ্ঠানই শতভাগ রপ্তানিমুখী। শিল্পপার্কটিতে শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কাজ করেন। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব কারখানায় দৈনিক অনুমোদিত গ্যাসের চাহিদা ১৩ দশমিক ৬ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে মাত্র ৩ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। বুধবার রাত ১২টা থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
স্টার সিরামিক্সের প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা পল্লব জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানেও বেশ কিছুদিন ধরে চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। বুধবার দুপুর থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজ করেন। বুধবার বিকেল পৌনে ৪টা থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিদিন প্রায় ৩৮ হাজার মেট্রিক টন সুতা উৎপাদন হতো। গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
হবিগঞ্জের একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ফরাস দেবনাথ জানান, কয়েকদিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। এখন পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানার কাজও বন্ধ রয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মস্থলে এসে অলস সময় কাটাচ্ছেন। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তাদের আয়-রোজগার ও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, হবিগঞ্জের সব শিল্পকারখানায় একইভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা হয়নি। কিছু প্রতিষ্ঠানে এখনো গ্যাস সরবরাহ রয়েছে। একই এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে গ্যাস সরবরাহে এমন পার্থক্যকে তিনি বৈষম্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। কয়েকদিন ধরে গ্যাস সংকট চললেও বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গ্যাস সরবরাহ একেবারে শূন্য হয়ে গেছে। ফলে শিল্পপার্কের সব কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ২০ মেগাওয়াট। কিন্তু বুধবার বিকেল ৩টা থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রপ্তানিমুখী হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে নেওয়া অর্ডারের বিপরীতে বর্তমানে উৎপাদন করা যাচ্ছে না। সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ভবিষ্যতে বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী। আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে রপ্তানিমুখী। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে উৎপাদন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকেই হবিগঞ্জে গ্যাস সংকট শুরু হয়। প্রথমদিকে চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হলেও কোনোভাবে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছিল। কিন্তু বুধবার থেকে সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস সরবরাহ কমানো বা বন্ধের বিষয়ে একাধিক চিঠি দিয়েছে। তবে কেন সরবরাহ কমানো বা বন্ধ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে চিঠিগুলোতে স্পষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী জানান, গ্যাস সংকট জাতীয় সমস্যা। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকেই এ সংকট শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে।
বাংলার খবর ডেস্ক : 


























