
রাজশাহীতে সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার কথা জানাচ্ছে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ। তবে মাঠপর্যায়ে এর ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময়ে ডিলারের দোকানে সার মিলছে না। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীর সরকারি গুদামগুলোতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। ফলে জেলায় সার সংকট নেই বলে দাবি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। তবে কৃষকদের অভিযোগ, গুদাম থেকে ডিলার এবং ডিলার থেকে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানোর ব্যবস্থায় কোথাও সমস্যা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি পুঠিয়ায় সারের দাবিতে কৃষকদের মহাসড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে। কৃষকদের ভাষ্য, আমন ধানের জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিলারের দোকানে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না। ভোরে এসে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে সার না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
ঝলমলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল আওয়াল বলেন, কয়েক দিন ধরে বাজারে ঘুরেও ডিলারের কাছ থেকে সার পাননি। তাঁর অভিযোগ, বাড়তি টাকা দিলে খুচরা বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষক নরেন কর্মকার বলেন, ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও সার পাওয়া যায়নি। সময়মতো জমিতে সার দিতে না পারলে ধানের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও কৃষকের হাতে তা পৌঁছাচ্ছে না কেন—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
আরেক কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর বলা হয় সার শেষ হয়ে গেছে। সরকারি বরাদ্দের সার কোথায় যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
এদিকে নগরীর নওদাপাড়া এলাকায় বিএডিসির সার গুদাম পরিদর্শন শেষে বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী রাজশাহীতে সার সংকট নেই বলে জানিয়েছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিসিআইসির বাফার গুদামে ৯ হাজার ৮০৪ টন ইউরিয়া, ৪৩০ টন টিএসপি ও ৮৫ টন ডিএপি মজুত রয়েছে। বিএডিসির গুদামে রয়েছে ৬ হাজার ৩১২ টন টিএসপি, ৮০১ টন এমওপি এবং ৪ হাজার ৩৪৮ টন ডিএপি।
বিভাগীয় কমিশনার জানান, চলতি মাসে রাজশাহী জেলায় টিএসপির বরাদ্দ ১ হাজার ৪৫ টন। এর বিপরীতে বিএডিসির গুদামেই প্রায় ৬ হাজার ৩০০ টন টিএসপি রয়েছে। একইভাবে ইউরিয়ার মাসিক বরাদ্দ ৫ হাজার ৭০০ টন হলেও বিসিআইসি বাফার গুদামে প্রায় ১০ হাজার টন মজুত রয়েছে।
তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী ডিলারদের কাছে নিয়মিত সার সরবরাহ করা হচ্ছে এবং ডিলাররা তা বিক্রি করছেন।
তবে গুদামে সার থাকার দাবির মধ্যেই গোদাগাড়ীতে এক ডিলারের গুদাম থেকে ৮১৭ বস্তা সার উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। দুই দফা অভিযান চালিয়ে মেসার্স কৃষি ঘর নামের ওই ডিলারের গুদাম থেকে ৬১৬ বস্তা এমওপি ও ২০১ বস্তা টিএসপি উদ্ধার করা হয়। অবৈধভাবে সার মজুতের অভিযোগে ডিলার সোলাইমান পাটোয়ারীকে এক মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সোলাইমান বিসিআইসি ও বিএডিসির সার ডিলার। সার মজুত ও বিক্রির বিষয়ে তাকে আগেও সতর্ক করা হয়েছিল। এরপরও বিপুল পরিমাণ সার গুদামে মজুত রাখার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান বলেন, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে ডিলারদের গুদাম ও বিক্রয়কেন্দ্রে তদারকি করা হচ্ছে। কেউ অবৈধভাবে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা কৃষকদের হয়রানি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষকদের অভিযোগ, কোনো কোনো ডিলারের দোকানে সার না থাকলেও একই এলাকার অন্য বিক্রয়কেন্দ্রে বাড়তি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি বরাদ্দের সার কীভাবে খুচরা বাজারে যাচ্ছে, সেটিও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু সরকারি গুদামে কত পরিমাণ সার মজুত আছে, তা জানলেই মাঠের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যায় না। বরাদ্দের পরিমাণ, ডিলারের উত্তোলন, বিক্রি এবং কৃষকের হাতে পৌঁছানোর হিসাব পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কৃষকদের দাবি, কোন ডিলার কত সার পেয়েছেন, কতটা উত্তোলন ও বিক্রি করেছেন এবং বর্তমানে তাঁদের গুদামে কত মজুত রয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত যাচাই করা হলে সরবরাহ ব্যবস্থার অনিয়ম চিহ্নিত করা সহজ হবে। কারণ সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও নির্ধারিত সময়ে কৃষকের হাতে সার না পৌঁছানোর কারণই এখন রাজশাহীর কৃষকদের প্রধান প্রশ্ন।
বাংলার খবর ডেস্ক : 




















