ঢাকা ১০:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ৭২ কেজি গাঁজাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার, মাধবপুরে পুলিশের অভিযান Logo গায়ক আসিফ আকবর গ্রেফতার Logo স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে এমপি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সলের সৌজন্য সাক্ষাৎ Logo সীমান্তে অব্যাহত বিএসএফের পুশইনের চেষ্টা, কঠোর অবস্থানে বিজিবি Logo মাধবপুরে সুরমা চা বাগান থেকে অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ উদ্ধার Logo মাধবপুরে চুরির অভিযোগে যুবকের মাথা ন্যাড়া, আঁকা হলো আর্জেন্টিনার পতাকা Logo চুনারুঘাটে বসতঘর থেকে প্রবাসীর স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার, হত্যার অভিযোগ Logo চুনারুঘাটে সিলিকা বালু পাচারের সময় আটক ১, দুই মাসের কারাদণ্ড Logo নব দিগন্ত ক্লাবের নতুন কমিটি গঠন Logo মাধবপুরে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সচেতনতামূলক সমাবেশ

সন্তানকে শুধু শিক্ষিত নয়, আদর্শ মানুষ বানান (ডিগ্রি নয়, চরিত্রই পিতা-মাতার প্রকৃত সফলতা)

লেখক: মুফতি মাওলানা মোঃ নজরুল ইসলাম খান

সম্প্রতি একটি হৃদয়বিদারক সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজধানীর একটি ফ্ল্যাটে এক বৃদ্ধা মায়ের মরদেহ প্রায় সাত দিন ধরে পড়ে ছিল। প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে বিষয়টি জানতে পারেন। অথচ তাঁর সন্তানদের কেউ রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত।

এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি সন্তানদের শুধু শিক্ষিত করছি, নাকি প্রকৃত মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলছি? ডিগ্রি, চাকরি, অর্থ-সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদা অর্জন করলেও যদি একজন সন্তান পিতা-মাতার খোঁজ না রাখে, তবে সেই শিক্ষার প্রকৃত মূল্য কোথায়?

এটি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; বরং আধুনিক বিশ্বের একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। উন্নত প্রযুক্তি ও উচ্চ জীবনমানের দেশ জাপানেও ‘হিকিকোমরি’ এবং ‘সোলিটারি ডেথ’ বা নিঃসঙ্গ মৃত্যুর মতো সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী জীবনযাপন এবং নিঃসঙ্গ মৃত্যুর ঘটনা সেখানে বাড়ছে।

বাংলাদেশও কি ধীরে ধীরে একই পথে এগোচ্ছে? আমাদের পারিবারিক বন্ধন, আত্মীয়তার সম্পর্ক, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ববোধ কি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে? যদি পরিবারকেন্দ্রিক নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও দ্বীনি চেতনার চর্চা জোরদার না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের সমাজও একই ধরনের সংকটে পড়তে পারে।

ইসলাম শুধু শিক্ষিত মানুষ নয়, আদর্শ মানুষ গড়ার শিক্ষা দেয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।”

— সূরা আত-তাহরীম: ৬

এই আয়াতে সন্তানদের শুধু দুনিয়াবি শিক্ষায় শিক্ষিত করার কথা বলা হয়নি; বরং ঈমান, চরিত্র, নৈতিকতা ও আখিরাতের সফলতার জন্য প্রস্তুত করার দায়িত্বও পিতা-মাতার ওপর অর্পণ করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

“কোনো পিতা তার সন্তানকে উত্তম চরিত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো উপহার দিতে পারে না।”

— জামে তিরমিযি

বর্তমান সমাজে এমন বহু ঘটনা দেখা যায়, যেখানে উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত সন্তানও বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে অবহেলা করে। কেউ বৃদ্ধাশ্রমে, কেউ নিঃসঙ্গতায়, আবার কেউ অসহায় অবস্থায় জীবন কাটান। অথচ ছোটবেলা থেকেই যদি সন্তানদের মধ্যে পিতা-মাতার প্রতি সম্মান, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতি জাগ্রত করা হয়, তাহলে এমন করুণ বাস্তবতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ইসলামী শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো মানুষ গড়া। কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষা, আদব-আখলাক, উস্তাদের প্রতি সম্মান, পিতা-মাতার খেদমত, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে একজন মানুষ নৈতিকতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।

তবে আদর্শ মানুষ গঠনের দায়িত্ব শুধু কোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নয়। পরিবার, সমাজ, মসজিদ, স্কুল, কলেজ এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি প্রজন্মকে নৈতিক, মানবিক ও দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

সন্তানকে শুধু শিক্ষিত বানানোর চেষ্টা করবেন না; তাকে আল্লাহভীরু, মানবিক, দায়িত্বশীল ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন। কারণ ডিগ্রি মানুষকে চাকরি দিতে পারে, কিন্তু চরিত্র মানুষকে সম্মানিত করে। সম্পদ মানুষকে ধনী করতে পারে, কিন্তু আদর্শ মানুষ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সফল করে।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সন্তানদের হাতে শুধু সনদ নয়, মূল্যবোধ তুলে দেওয়া; শুধু পেশা নয়, দায়িত্ববোধ শেখানো; শুধু সফলতা নয়, মানবিকতা ও আল্লাহভীতি শিক্ষা দেওয়া।

কারণ ডিগ্রি একজন মানুষকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, কিন্তু চরিত্রই তাকে প্রকৃত মানুষ বানায়। আর একজন আদর্শ সন্তানই পিতা-মাতার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং মৃত্যুর পরও তাদের জন্য সদকায়ে জারিয়ার উৎস।

আপলোডকারীর তথ্য

বাংলার খবর

জনপ্রিয় সংবাদ

৭২ কেজি গাঁজাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার, মাধবপুরে পুলিশের অভিযান

সন্তানকে শুধু শিক্ষিত নয়, আদর্শ মানুষ বানান (ডিগ্রি নয়, চরিত্রই পিতা-মাতার প্রকৃত সফলতা)

আপডেট সময় ১২:০২:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

লেখক: মুফতি মাওলানা মোঃ নজরুল ইসলাম খান

সম্প্রতি একটি হৃদয়বিদারক সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজধানীর একটি ফ্ল্যাটে এক বৃদ্ধা মায়ের মরদেহ প্রায় সাত দিন ধরে পড়ে ছিল। প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে বিষয়টি জানতে পারেন। অথচ তাঁর সন্তানদের কেউ রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত।

এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি সন্তানদের শুধু শিক্ষিত করছি, নাকি প্রকৃত মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলছি? ডিগ্রি, চাকরি, অর্থ-সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদা অর্জন করলেও যদি একজন সন্তান পিতা-মাতার খোঁজ না রাখে, তবে সেই শিক্ষার প্রকৃত মূল্য কোথায়?

এটি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; বরং আধুনিক বিশ্বের একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। উন্নত প্রযুক্তি ও উচ্চ জীবনমানের দেশ জাপানেও ‘হিকিকোমরি’ এবং ‘সোলিটারি ডেথ’ বা নিঃসঙ্গ মৃত্যুর মতো সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী জীবনযাপন এবং নিঃসঙ্গ মৃত্যুর ঘটনা সেখানে বাড়ছে।

বাংলাদেশও কি ধীরে ধীরে একই পথে এগোচ্ছে? আমাদের পারিবারিক বন্ধন, আত্মীয়তার সম্পর্ক, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ববোধ কি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে? যদি পরিবারকেন্দ্রিক নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও দ্বীনি চেতনার চর্চা জোরদার না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের সমাজও একই ধরনের সংকটে পড়তে পারে।

ইসলাম শুধু শিক্ষিত মানুষ নয়, আদর্শ মানুষ গড়ার শিক্ষা দেয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।”

— সূরা আত-তাহরীম: ৬

এই আয়াতে সন্তানদের শুধু দুনিয়াবি শিক্ষায় শিক্ষিত করার কথা বলা হয়নি; বরং ঈমান, চরিত্র, নৈতিকতা ও আখিরাতের সফলতার জন্য প্রস্তুত করার দায়িত্বও পিতা-মাতার ওপর অর্পণ করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

“কোনো পিতা তার সন্তানকে উত্তম চরিত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো উপহার দিতে পারে না।”

— জামে তিরমিযি

বর্তমান সমাজে এমন বহু ঘটনা দেখা যায়, যেখানে উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত সন্তানও বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে অবহেলা করে। কেউ বৃদ্ধাশ্রমে, কেউ নিঃসঙ্গতায়, আবার কেউ অসহায় অবস্থায় জীবন কাটান। অথচ ছোটবেলা থেকেই যদি সন্তানদের মধ্যে পিতা-মাতার প্রতি সম্মান, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতি জাগ্রত করা হয়, তাহলে এমন করুণ বাস্তবতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ইসলামী শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো মানুষ গড়া। কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষা, আদব-আখলাক, উস্তাদের প্রতি সম্মান, পিতা-মাতার খেদমত, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে একজন মানুষ নৈতিকতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।

তবে আদর্শ মানুষ গঠনের দায়িত্ব শুধু কোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নয়। পরিবার, সমাজ, মসজিদ, স্কুল, কলেজ এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি প্রজন্মকে নৈতিক, মানবিক ও দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

সন্তানকে শুধু শিক্ষিত বানানোর চেষ্টা করবেন না; তাকে আল্লাহভীরু, মানবিক, দায়িত্বশীল ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন। কারণ ডিগ্রি মানুষকে চাকরি দিতে পারে, কিন্তু চরিত্র মানুষকে সম্মানিত করে। সম্পদ মানুষকে ধনী করতে পারে, কিন্তু আদর্শ মানুষ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সফল করে।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সন্তানদের হাতে শুধু সনদ নয়, মূল্যবোধ তুলে দেওয়া; শুধু পেশা নয়, দায়িত্ববোধ শেখানো; শুধু সফলতা নয়, মানবিকতা ও আল্লাহভীতি শিক্ষা দেওয়া।

কারণ ডিগ্রি একজন মানুষকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, কিন্তু চরিত্রই তাকে প্রকৃত মানুষ বানায়। আর একজন আদর্শ সন্তানই পিতা-মাতার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং মৃত্যুর পরও তাদের জন্য সদকায়ে জারিয়ার উৎস।