ঢাকা ১০:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo লাখাইয়ে সিংহ ও করাব গ্রামের বিরোধে উত্তেজনা, বন্ধ বুল্লা বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য Logo মরমি সাধক শেখ ভানু শাহ: কালজয়ী গানে আজও বেঁচে আছেন লাখাইয়ের ভাদিকারা গ্রামে Logo খলিলুর রহমানের গণসংযোগের পোস্টে মান্নান আখনের প্রশ্ন, ‘এটা কি ঠিক হচ্ছে ভাই’ Logo দলীয় মনোনয়নের আগেই হাইমচরে খলিলুর রহমান পাটওয়ারীর গণসংযোগ Logo নোয়াপাড়া চা বাগানে সাপ্তাহিক মজুরি পাননি শ্রমিকরা, শূন্য হাতে ফিরলেন বাড়ি Logo কচুরিপানার আগ্রাসনে চাষের অনুপযোগী লাখাইয়ের হাওর, বোরো আবাদ নিয়ে শঙ্কায় কৃষক Logo জামালপুরে ২১৭ বোতল ভারতীয় মদসহ ছাত্রদল নেতা গ্রেপ্তার, সব পদ থেকে অব্যাহতি Logo হাইমচরে দুই প্রতিষ্ঠানে অভিযান, জরিমানা ৫৫ হাজার টাকা Logo নারী আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন এলিজা জামান Logo প্রবাসে না গিয়ে চুনারুঘাটের ইমরানের সাফল্য, ‘সুগান মন্ত্রী’ তেল রপ্তানি করে আয় করছেন বৈদেশিক মুদ্রা

মরমি সাধক শেখ ভানু শাহ: কালজয়ী গানে আজও বেঁচে আছেন লাখাইয়ের ভাদিকারা গ্রামে

পারভেজ হাসান:

হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ভাদিকারা গ্রাম। এই গ্রামেই জন্মেছিলেন বাংলা মরমি সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক সংগীতের অন্যতম সাধক শেখ ভানু শাহ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছাড়াই নিজের চিন্তা, সাধনা ও জীবনবোধ দিয়ে তিনি প্রায় এক হাজার মরমি গান, পুঁথি, বারোমাসি ও কবিতা রচনা করেছিলেন বলে স্থানীয় ঐতিহ্য ও তাঁর জীবনকথাসংক্রান্ত বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তাঁর গানে উঠে এসেছে প্রেম, বিরহ, আত্মজিজ্ঞাসা, মানবজীবনের নশ্বরতা, নৈতিকতা এবং স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের আকুলতা। শতাধিক বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর গান ও সাধনজীবনের স্মৃতি আজও বেঁচে আছে লাখাইয়ের ভাদিকারা গ্রামে।

শেখ ভানু শাহের জন্মসাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে ১৮৪৯ ও ১৮৫৯ সালের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর জন্মস্থান হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ভাদিকারা গ্রাম। তাঁর পিতার নাম মুন্সি নাসিরুদ্দিন। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। শৈশব থেকেই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে ওঠেন। ধানের ব্যবসার কারণে তিনি ‘ভানু ব্যাপারী’ নামেও পরিচিতি লাভ করেন। তবে ব্যবসায়িক জীবনের সাফল্যের মধ্যেই একসময় তাঁর মনে জাগে আত্মজিজ্ঞাসা ও আধ্যাত্মিক সাধনার আকাঙ্ক্ষা।

প্রচলিত জীবনকথা অনুযায়ী, একদিন ধানের ব্যবসার কাজে নৌকায় যাত্রার সময় মেঘনা নদীর তীরবর্তী মাদনা নৌবন্দরের কাছে নদীর বাঁকে একটি মৃতদেহ ভেসে যেতে দেখেন তিনি। মৃতদেহটির চোখ কাক ঠুকরে খাচ্ছিল। জীবনের এমন করুণ পরিণতি তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। যে জীবন নিয়ে মানুষের এত অহংকার, সম্পদ ও সংসারের মোহ—মৃত্যুর পর সেই জীবনের পরিণতি কী, এমন প্রশ্ন তাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়, মৃতদেহটি দেখার পর তিনি নদীতে ঝাঁপ দেন। সঙ্গে থাকা লোকজন তাঁকে খুঁজতে নদীতে জাল ফেলেও সন্ধান পাননি। পরে তাঁরা বাড়িতে ফিরে গিয়ে শেখ ভানু শাহকে সেখানে দেখতে পান বলে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে। অনেকে ঘটনাটিকে অলৌকিক বলে বর্ণনা করেন। তবে এর স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ নিশ্চিত নয়। তাই ঘটনাটিকে তাঁর জীবনকে ঘিরে প্রচলিত লোককথা হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রচলিত জীবনকথায় বলা হয়, এই ঘটনার পর তাঁর চিন্তাজগতে গভীর পরিবর্তন আসে। পার্থিব সম্পদের অনিত্যতা, মৃত্যুর অনিবার্যতা এবং মানুষের আত্মিক পরিচয় অনুসন্ধান তাঁকে আধ্যাত্মিক সাধনার পথে নিয়ে যায়। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি সুফি সাধক মীরান শাহ তাঁতারীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর কাছ থেকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেখ ভানু শাহের সাধনজীবন আরও গভীর হয়ে ওঠে।

শেখ ভানু শাহের জীবন ও সাহিত্যকর্মের অন্যতম আলোচিত দিক হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে তাঁর সৃজনশীলতা। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় এক হাজার মরমি গান, পুঁথি, বারোমাসি ও কবিতা রচনা করেন। তাঁর রচনার প্রকৃত সংখ্যা ও সম্পূর্ণ তালিকা নির্ধারণের জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন হলেও বাংলা মরমি সংগীতের ঐতিহ্যে তাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

তাঁর সাহিত্যকর্মে ধর্মীয় অনুভূতি, সুফি ভাবধারা, মানবিক প্রেম, বিরহ, আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব ও নৈতিক জীবনবোধের প্রকাশ ঘটেছে। সহজ-সরল আঞ্চলিক ভাষা এবং পরিচিত উপমার সাহায্যে তিনি গভীর আধ্যাত্মিক ভাবনা তুলে ধরেছেন। তাঁর রচনায় মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে অন্তরের পরিচ্ছন্নতা, আত্মশুদ্ধি ও সত্যের অনুসন্ধান অধিক গুরুত্ব পেয়েছে।

তাঁর নামে ‘আশরারুল এশক’, ‘চেহেল অজুদ’ ও ‘পুঁথি শেখ ভানু’সহ কয়েকটি গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এসব গ্রন্থের নাম, বানান, মূল পাণ্ডুলিপি ও প্রকাশনার ইতিহাস নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁর রচনাসম্ভার সংগ্রহ, সম্পাদনা ও সংরক্ষণ করা গেলে বাংলা মরমি সাহিত্য নিয়ে গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

শেখ ভানু শাহের পরিচিতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তাঁর মরমি গান। তাঁর নামে প্রচলিত ‘নিশীতে যাইও ফুলবনে রে, ভ্রমরা নিশীতে যাইও ফুলবনে’ গানটি বাংলা লোকসংগীতের জগতে বিশেষ পরিচিত। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী শচীন দেববর্মনের কণ্ঠে গানটির পরিবেশনা এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে গানটির রচয়িতা এবং বিভিন্ন পরিবেশনায় ব্যবহৃত কথার উৎস নিয়ে ভিন্ন দাবি থাকায় মূল রচনা ও ঐতিহাসিক সূত্র যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

শেখ ভানু শাহের গান শুধু প্রেম ও বিরহের অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর রচনায় জীবনের গভীর অর্থ, আত্মার পরিচয় এবং পার্থিব মোহ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও প্রতিফলিত হয়েছে। সহজ ভাষায় জটিল আধ্যাত্মিক ভাবনা প্রকাশের ক্ষমতা তাঁর গানকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে বলে তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে প্রচলিত আলোচনায় উঠে আসে।

লাখাইয়ের ভাদিকারা গ্রাম আজও এই মরমি সাধকের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাঁর জীবন, সাধনা ও গানকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আগ্রহ বাংলা লোকঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে তাঁর জীবনকথার প্রচলিত উপাখ্যান, রচনার সংখ্যা এবং সাহিত্যকর্মের প্রামাণ্য তথ্য আরও নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

শেখ ভানু শাহের রচনাসম্ভার সংগ্রহ, নির্ভরযোগ্যভাবে সংরক্ষণ এবং গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা গেলে বাংলা মরমি সাহিত্য ও লোকসংগীতের ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হবে। সময়ের ব্যবধানে তাঁর জীবন সম্পর্কে নানা তথ্য নিয়ে মতভেদ থাকলেও, তাঁর নামে প্রচলিত গান ও সাধনার স্মৃতি লাখাইয়ের ভাদিকারা গ্রামকে আজও বিশেষ পরিচিতি দিয়ে চলেছে।

আপলোডকারীর তথ্য
Avatar photo

Sekh Sadi

জনপ্রিয় সংবাদ

লাখাইয়ে সিংহ ও করাব গ্রামের বিরোধে উত্তেজনা, বন্ধ বুল্লা বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য

error:

মরমি সাধক শেখ ভানু শাহ: কালজয়ী গানে আজও বেঁচে আছেন লাখাইয়ের ভাদিকারা গ্রামে

আপডেট সময় ১০:৩৩:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

পারভেজ হাসান:

হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ভাদিকারা গ্রাম। এই গ্রামেই জন্মেছিলেন বাংলা মরমি সাহিত্য ও আধ্যাত্মিক সংগীতের অন্যতম সাধক শেখ ভানু শাহ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছাড়াই নিজের চিন্তা, সাধনা ও জীবনবোধ দিয়ে তিনি প্রায় এক হাজার মরমি গান, পুঁথি, বারোমাসি ও কবিতা রচনা করেছিলেন বলে স্থানীয় ঐতিহ্য ও তাঁর জীবনকথাসংক্রান্ত বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তাঁর গানে উঠে এসেছে প্রেম, বিরহ, আত্মজিজ্ঞাসা, মানবজীবনের নশ্বরতা, নৈতিকতা এবং স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের আকুলতা। শতাধিক বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর গান ও সাধনজীবনের স্মৃতি আজও বেঁচে আছে লাখাইয়ের ভাদিকারা গ্রামে।

শেখ ভানু শাহের জন্মসাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে ১৮৪৯ ও ১৮৫৯ সালের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর জন্মস্থান হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ভাদিকারা গ্রাম। তাঁর পিতার নাম মুন্সি নাসিরুদ্দিন। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। শৈশব থেকেই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে ওঠেন। ধানের ব্যবসার কারণে তিনি ‘ভানু ব্যাপারী’ নামেও পরিচিতি লাভ করেন। তবে ব্যবসায়িক জীবনের সাফল্যের মধ্যেই একসময় তাঁর মনে জাগে আত্মজিজ্ঞাসা ও আধ্যাত্মিক সাধনার আকাঙ্ক্ষা।

প্রচলিত জীবনকথা অনুযায়ী, একদিন ধানের ব্যবসার কাজে নৌকায় যাত্রার সময় মেঘনা নদীর তীরবর্তী মাদনা নৌবন্দরের কাছে নদীর বাঁকে একটি মৃতদেহ ভেসে যেতে দেখেন তিনি। মৃতদেহটির চোখ কাক ঠুকরে খাচ্ছিল। জীবনের এমন করুণ পরিণতি তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। যে জীবন নিয়ে মানুষের এত অহংকার, সম্পদ ও সংসারের মোহ—মৃত্যুর পর সেই জীবনের পরিণতি কী, এমন প্রশ্ন তাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়, মৃতদেহটি দেখার পর তিনি নদীতে ঝাঁপ দেন। সঙ্গে থাকা লোকজন তাঁকে খুঁজতে নদীতে জাল ফেলেও সন্ধান পাননি। পরে তাঁরা বাড়িতে ফিরে গিয়ে শেখ ভানু শাহকে সেখানে দেখতে পান বলে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে। অনেকে ঘটনাটিকে অলৌকিক বলে বর্ণনা করেন। তবে এর স্বাধীন ঐতিহাসিক প্রমাণ নিশ্চিত নয়। তাই ঘটনাটিকে তাঁর জীবনকে ঘিরে প্রচলিত লোককথা হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রচলিত জীবনকথায় বলা হয়, এই ঘটনার পর তাঁর চিন্তাজগতে গভীর পরিবর্তন আসে। পার্থিব সম্পদের অনিত্যতা, মৃত্যুর অনিবার্যতা এবং মানুষের আত্মিক পরিচয় অনুসন্ধান তাঁকে আধ্যাত্মিক সাধনার পথে নিয়ে যায়। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি সুফি সাধক মীরান শাহ তাঁতারীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর কাছ থেকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেখ ভানু শাহের সাধনজীবন আরও গভীর হয়ে ওঠে।

শেখ ভানু শাহের জীবন ও সাহিত্যকর্মের অন্যতম আলোচিত দিক হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে তাঁর সৃজনশীলতা। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় এক হাজার মরমি গান, পুঁথি, বারোমাসি ও কবিতা রচনা করেন। তাঁর রচনার প্রকৃত সংখ্যা ও সম্পূর্ণ তালিকা নির্ধারণের জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন হলেও বাংলা মরমি সংগীতের ঐতিহ্যে তাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

তাঁর সাহিত্যকর্মে ধর্মীয় অনুভূতি, সুফি ভাবধারা, মানবিক প্রেম, বিরহ, আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব ও নৈতিক জীবনবোধের প্রকাশ ঘটেছে। সহজ-সরল আঞ্চলিক ভাষা এবং পরিচিত উপমার সাহায্যে তিনি গভীর আধ্যাত্মিক ভাবনা তুলে ধরেছেন। তাঁর রচনায় মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে অন্তরের পরিচ্ছন্নতা, আত্মশুদ্ধি ও সত্যের অনুসন্ধান অধিক গুরুত্ব পেয়েছে।

তাঁর নামে ‘আশরারুল এশক’, ‘চেহেল অজুদ’ ও ‘পুঁথি শেখ ভানু’সহ কয়েকটি গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এসব গ্রন্থের নাম, বানান, মূল পাণ্ডুলিপি ও প্রকাশনার ইতিহাস নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁর রচনাসম্ভার সংগ্রহ, সম্পাদনা ও সংরক্ষণ করা গেলে বাংলা মরমি সাহিত্য নিয়ে গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

শেখ ভানু শাহের পরিচিতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তাঁর মরমি গান। তাঁর নামে প্রচলিত ‘নিশীতে যাইও ফুলবনে রে, ভ্রমরা নিশীতে যাইও ফুলবনে’ গানটি বাংলা লোকসংগীতের জগতে বিশেষ পরিচিত। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী শচীন দেববর্মনের কণ্ঠে গানটির পরিবেশনা এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে গানটির রচয়িতা এবং বিভিন্ন পরিবেশনায় ব্যবহৃত কথার উৎস নিয়ে ভিন্ন দাবি থাকায় মূল রচনা ও ঐতিহাসিক সূত্র যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

শেখ ভানু শাহের গান শুধু প্রেম ও বিরহের অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর রচনায় জীবনের গভীর অর্থ, আত্মার পরিচয় এবং পার্থিব মোহ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও প্রতিফলিত হয়েছে। সহজ ভাষায় জটিল আধ্যাত্মিক ভাবনা প্রকাশের ক্ষমতা তাঁর গানকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে বলে তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে প্রচলিত আলোচনায় উঠে আসে।

লাখাইয়ের ভাদিকারা গ্রাম আজও এই মরমি সাধকের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাঁর জীবন, সাধনা ও গানকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আগ্রহ বাংলা লোকঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে তাঁর জীবনকথার প্রচলিত উপাখ্যান, রচনার সংখ্যা এবং সাহিত্যকর্মের প্রামাণ্য তথ্য আরও নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

শেখ ভানু শাহের রচনাসম্ভার সংগ্রহ, নির্ভরযোগ্যভাবে সংরক্ষণ এবং গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা গেলে বাংলা মরমি সাহিত্য ও লোকসংগীতের ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হবে। সময়ের ব্যবধানে তাঁর জীবন সম্পর্কে নানা তথ্য নিয়ে মতভেদ থাকলেও, তাঁর নামে প্রচলিত গান ও সাধনার স্মৃতি লাখাইয়ের ভাদিকারা গ্রামকে আজও বিশেষ পরিচিতি দিয়ে চলেছে।