
মাধবপুর (হবিগঞ্জ) সংবাদদাতা:
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা জুড়ে দিনরাত অবৈধভাবে মাটি, বালু ও সিলিকা বালু উত্তোলনের মহা উৎসব চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মাটি ও বালু খেকো চক্র পরিবেশ আইন ও বিধি অমান্য করে পাহাড়ি ছড়া, খাল, নদী ও ফসলি জমি থেকে বেপরোয়া ভাবে সিলিকা বালু, সাধারণ বালু ও মাটি উত্তোলন করছে।
আইনজীবী ঝন্টু দেব বলেন, আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থেকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাটি উত্তোলন করতে পারে না। উর্বর কৃষি জমির টপসয়েল কেটে শ্রেণি পরিবর্তন করা এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৬ ধারা অনুযায়ী প্রাকৃতিক টিলা ও পাহাড় নিধন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৮৯ অনুযায়ী কৃষি জমির উপরের মাটি কাটা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। প্রথমবার অপরাধে দুই লাখ টাকা জরিমানা ও দুই বছরের কারাদণ্ড এবং পুনরায় অপরাধে ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে এসব আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবাধে চলছে বালু ও মাটি পাচার। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, যারা এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন, তাদের জীবন নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। অনেককে হয়রানি, মিথ্যা মামলা ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমির মালিকরা বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে দাবি করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, দায়িত্বশীল কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করেই এসব অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার ছাতিয়াইন, বাঘাসুরা, নোয়াপাড়া, জগদীশপুর, বুল্লা, আন্দিউড়া, শাহজাহানপুর, বহরা ও চৌমুহনী ইউনিয়নের বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া, খাল, নদী ও ফসলি জমি থেকে রাতের আঁধারে ড্রেজার ও এক্সক্যাভেটর দিয়ে মাটি ও বালু উত্তোলন করে ট্রাক্টর ও ট্রাকে সরবরাহ করা হচ্ছে।
সোনাই নদী-এর পাড়জুড়ে চৌমুহনী ইউনিয়নের আলাবক্সপুর, মঙ্গলপুর, অলিপুর, মহব্বতপুর ও হরিণখোলা এলাকায় অন্তত ১৫টি বিশাল বালুর স্তুপ রাখা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। বহরা ইউনিয়নের রাবার ড্যাম এলাকাসহ একাধিক স্থানে অবাধে সিলিকা ও সাধারণ বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নদীর বাঁধের মাটিও কেটে নেওয়া হচ্ছে।
বুল্লা ইউনিয়নের জনপোড়া এলাকায় কৃষিজমির টপসয়েল কেটে নেওয়ায় জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। আন্দিউড়া ইউনিয়নের সুলতানপুর ও দুর্গাপুর, শাহজাহানপুর ইউনিয়নের সিমনা ছড়া, জগদীশপুরের রসুলপুর, নোয়াপাড়া ও বাঘাসুরা ইউনিয়নের উত্তর শাহপুর ও হিরিতলা এলাকাতেও প্রতিদিন সিলিকা বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এসব অবৈধ কার্যক্রমের ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। পাহাড়ি ছড়ার স্বাভাবিক গতিপথ নষ্ট হচ্ছে, পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়ছে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে কয়েকজন বিএনপি নেতাকে সামনে রেখে বালু ও মাটির ব্যবসা পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাহিদ বিন কাশেম বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কিছু স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আইন ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের আশা, প্রশাসন দ্রুত কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
বাংলার খবর ডেস্ক : 






















