
দেশের আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে চরম অস্থিরতা, অনিয়ম ও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে বিধিবহির্ভূত নিয়োগ, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের হঠাৎ অব্যাহতি এবং দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও রেজিস্ট্রারকে চাপের মুখে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনিক অস্থিরতা শুরু হয়। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ চুক্তিভিত্তিক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আখতারুজ্জামানকে মাত্র ৩০ মিনিটের নোটিশে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এরপর রেজিস্ট্রার পদে লিয়েনে নিয়োগ দেওয়া হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়–এর উপ-রেজিস্ট্রার আইয়ুব হোসেনকে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ নিয়োগে কোনো বিজ্ঞপ্তি, লিখিত পরীক্ষা বা স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। আরও অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩ সালের আইন লঙ্ঘন করে নির্বাচনী বোর্ড বা সিন্ডিকেটের অনুমোদন ছাড়াই লিয়েনে দুইজন অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এসব নিয়োগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন লিখিত আপত্তি জানিয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কামিল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ডিন অধ্যাপক ড. ওয়ালীউল্লাহর বিরুদ্ধেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন মাদ্রাসার গভর্নিং বডিতে অধ্যক্ষের প্রস্তাবের বাইরে আর্থিক বিনিময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সভাপতি ও বিদ্যোৎসাহী সদস্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে বহু মাদ্রাসায় প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে এবং শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন পাচ্ছেন না। গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর অব্যাহতির আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এদিকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে নতুন করে মোহাম্মদ আলীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কাজে তার পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ভিসির পিএস আরিফুল ইসলাম ও সাবেক ছাত্রনেতা সাব্বীরকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর, সনদ শাখা ও ক্রয় কার্যক্রমে সরাসরি হস্তক্ষেপ শুরু করেন।
আরও অভিযোগ উঠেছে, তার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ফাজিল, কামিল ও অনার্সের শত শত শিক্ষার্থীর ফলাফল অকারণে ‘উইথহেল্ড’ বা স্থগিত রাখা হচ্ছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে, যার ফলে হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মোহাম্মদ আলী নিজেকে কখনো জামায়াত, কখনো বিএনপির বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিয়ে পদ আঁকড়ে রাখতে লবিং চালাচ্ছেন। এর পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্তদের টিকিয়ে রাখার চেষ্টা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মাদ্রাসার অধ্যক্ষ বলেন, বিতর্কিত ও অভিজ্ঞতাহীন কর্মকর্তাকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত ফল প্রকাশ করা হলেও এখনো বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল স্থগিত রয়েছে, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
এদিকে ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগসহ সামগ্রিক অনিয়ম এবং লিয়েন কর্মকর্তাদের বিষয়ে তদন্ত চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দাবি, দ্রুত এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাভাবিক ও স্বচ্ছ ধারায় ফিরিয়ে আনা হোক।
বাংলার খবর ডেস্ক : 

























