
আবদুর রউফ আশরাফ:
সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন জুমা। এ দিন দুনিয়ার ব্যস্ততা পেছনে ফেলে মুসলমানরা আল্লাহর ঘরে সমবেত হন। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, শিক্ষিত-অশিক্ষিত—সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে একই রবের দরবারে সিজদা করেন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আদায় করেন জুমার নামাজ। অথচ পরিতাপের বিষয়, মসজিদের ভেতরে যে ঐক্যের দৃশ্য দেখা যায়, মসজিদের বাইরে অনেক সময় তার প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায় না। ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলীয় বিভাজন, মতপার্থক্য, হিংসা-বিদ্বেষ ও সামাজিক বিরোধ আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে দুর্বল করে দিচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, জুমার জামাতে যে ঐক্যের শিক্ষা গ্রহণ করি, তা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারছি?
ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়; বরং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠারও শিক্ষা দেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৩)
এই আয়াত মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ থাকার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়। আল্লাহর দ্বীনকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং পারস্পরিক বিভেদ থেকে বেঁচে থাকা ঈমানি দায়িত্ব। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই পার্থক্য যেন শত্রুতা, বিদ্বেষ কিংবা সম্পর্কচ্ছেদের কারণ না হয়।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলেন, “নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।” (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১০)
এখানে মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে ভ্রাতৃত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এই ভ্রাতৃত্ব কেবল মুখের দাবি নয়; বরং বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, বিরোধ মীমাংসা করা এবং একে অপরের অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়ে এর বাস্তব প্রকাশ ঘটে।
জুমার নামাজ মুসলিম সমাজে ঐক্য ও সাম্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানে কারও সম্পদ, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচয় মর্যাদার চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়। সবাই একই কিবলামুখী হয়ে একই ইমামের অনুসরণ করেন। কাতারে দাঁড়ানোর এই দৃশ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মুমিনদের হৃদয়ের বন্ধনও হতে হবে সুদৃঢ়।
বংশ, অর্থবিত্ত কিংবা সামাজিক প্রতিপত্তি নয়; আল্লাহর কাছে মর্যাদার মূল ভিত্তি তাকওয়া। অথচ বাস্তব সমাজে অনেক সময় সম্পদ, পদ, বংশ কিংবা দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে মূল্যায়ন করা হয়। এই মানসিকতা ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জুমার জামাতে পাশাপাশি দাঁড়ানো যদি আমাদের হৃদয়ের দূরত্ব কমাতে না পারে, তাহলে সেই জামাত থেকে পাওয়া শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন।
মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি মুসলিম সমাজের নৈতিক ও মানবিক বন্ধন সুদৃঢ় করারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। জুমার খুতবায় মানুষের অধিকার, পারিবারিক বন্ধন, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং বিরোধ মীমাংসার গুরুত্ব তুলে ধরা হলে মুসল্লিরা ইবাদতের পাশাপাশি সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও পেতে পারেন।
সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কেবল আলেম, ইমাম কিংবা সামাজিক নেতাদের নয়; প্রত্যেক মুসলমানেরই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব রয়েছে। নিজের ভুল স্বীকার করা, অন্যের প্রতি ন্যায়বিচার করা, গিবত ও অপবাদ পরিহার করা, বিরোধে নিরপেক্ষ থাকা এবং ক্ষমা করার মানসিকতা গড়ে তোলা—এসবই বিভেদ দূর করার কার্যকর উপায়।
প্রতি সপ্তাহে জুমা আমাদের সামনে ঐক্য, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও আত্মশুদ্ধির নতুন সুযোগ নিয়ে আসে। আমরা একই কাতারে দাঁড়াই, একই রবের কাছে সিজদা করি এবং একই কুরআনের নির্দেশনা শুনি। অথচ আমাদের জীবনে যদি হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও বিভেদই প্রাধান্য পায়, তাহলে জুমার শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে ধারণ করার ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি রয়ে গেছে।
তাই আজ একান্ত প্রয়োজন জুমার জামাতের ঐক্যকে সমাজজীবনে ছড়িয়ে দেওয়া। মসজিদের কাতারে পাশাপাশি দাঁড়ানোর পাশাপাশি হৃদয়ের দূরত্ব কমানো, মতপার্থক্যের মধ্যেও সৌজন্য বজায় রাখা এবং বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা গড়ে তোলা।
আমরা যেন শুধু জুমার দিনে ঐক্যবদ্ধ মুসল্লি না হই; বরং সপ্তাহের প্রতিটি দিন, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়, মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্বের পরিচয় দিতে পারি। কারণ, প্রকৃত ঐক্য কেবল পাশাপাশি দাঁড়ানোর নাম নয়; বরং একে অপরের অধিকার রক্ষা করা, কল্যাণ কামনা করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সত্য ও ন্যায়ের পথে একসঙ্গে চলার নাম।
জুমার জামাতের ঐক্যের বন্ধনে ভেঙে যাক সমাজের বিভেদের দেয়াল।
লেখক: আবদুর রউফ আশরাফ, কো-অর্ডিনেটর ও শিক্ষক, ইকরা বাংলাদেশ স্কুল, হবিগঞ্জ।
বাংলার খবর ডেস্ক : 



















