ঢাকা ১০:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo লাখাইয়ে করাব ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি মেহেদী হাসান দুলাল গ্রেপ্তার Logo ৮ দিন পর দুই ইউনিটে উৎপাদনে ফিরল রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র Logo শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের ছুটি ২৩ সেপ্টেম্বর Logo সাতক্ষীরার সেই এমপি গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার Logo জামালপুরে বিচারকের বাসায় চুরি: আরও ৫ জন গ্রেপ্তার, আগের ৫ জন জড়িত নন Logo আখাউড়া সীমান্তে কাঁটাতারের পাশে কিশোরের মরদেহ, উদ্ধারে বিজিবি-বিএসএফের সমন্বয়ের উদ্যোগ Logo আশুলিয়ায় পোশাক কারখানায় আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৪ ইউনিট Logo সায়হাম গ্রুপের কারখানা পরিদর্শনে যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচা তুলা প্রতিনিধি দল Logo মাধবপুরে নবাগত উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ Logo ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের ছুটি নিয়ে মাধবপুরে বিভ্রান্তি

পাঠাগার আছে, পাঠক নেই; সংকটে মাধবপুরের পিয়াইম গণপাঠাগার

মোঃ আইয়ুব খান, মাধবপুর (হবিগঞ্জ):

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন ইউনিয়নের পিয়াইম গ্রামে গড়ে ওঠা পিয়াইম গণপাঠাগার একসময় জ্ঞানচর্চা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু বর্তমানে পাঠাগারটিতে বই থাকলেও নেই পর্যাপ্ত পাঠক। ফলে বইপড়ার সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

২০২২ সালে গ্রামের কৃতি সন্তান, অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ড. প্রদীপ রায়হানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় পিয়াইম গণপাঠাগার। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের নিবন্ধনপ্রাপ্ত এই পাঠাগারে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ বই রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সংগ্রহ করা হয়েছে আরও অনেক বই।

পাঠাগারটিতে পর্যাপ্ত চেয়ার, রিডিং টেবিল ও বই সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও পাঠক উপস্থিতি দিন দিন কমছে। পাঠাগারের রেজিস্টার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত তিন মাসে হাতে গোনা কয়েকজন পাঠক বই ইস্যু নিয়েছেন। অধিকাংশ সময় পাঠাগারের পাঠক কক্ষ ফাঁকাই পড়ে থাকে।

পাঠাগারের সম্পাদক ও লাইব্রেরিয়ান মোস্তফা কামাল জানান, পাঠাগার পরিচালনা করতে নিয়মিত ব্যয় বহন করতে হয়। তিনি মাসে ৫ হাজার টাকা সম্মানী পান। এছাড়া পরিচ্ছন্নতা কর্মী আয়েশা আক্তার ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর লিটন রায়ও মাসিক ৫ হাজার টাকা করে সম্মানী পেয়ে থাকেন। ভবন ভাড়া বাবদ ব্যয় হয় ৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মাসিক প্রায় ১৮ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়।

তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠাতা ড. প্রদীপ রায়হান ব্যক্তিগতভাবে নিয়মিত অর্থ সহায়তা করেন। এছাড়া কিছু সংস্কৃতিমনা মানুষও সহযোগিতা করে থাকেন। তাদের সহায়তায় পাঠাগারের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”

স্থানীয়দের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা ও মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার বইপড়ার অভ্যাস কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বিনোদনে বেশি সময় ব্যয় করছে। ফলে বইয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

শিক্ষানুরাগী সারোয়ার রহমান বলেন, “বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই বই পড়তে চায় না। লেখালেখির চর্চাও কমে গেছে। মোবাইল ফোনের কারণে ভাষা, ব্যাকরণ, সাহিত্য, কবিতা ও গল্পচর্চা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এটি একটি জাতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।”

এদিকে সম্প্রতি পাঠাগারের সভাপতি মিজবাহ উদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে সভাপতির পদ শূন্য হয়ে রয়েছে। ১১ সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা কমিটি থাকলেও কমিটির কার্যক্রম আগের মতো সক্রিয় নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়মিত সভা ও পরিকল্পনামূলক কর্মকাণ্ডের অভাবও পাঠাগারের প্রাণচাঞ্চল্য কমিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সাংবাদিক জালাল উদ্দিন লস্কর বলেন, শুধুমাত্র বই সংগ্রহ করলেই পাঠাগার প্রাণবন্ত হয় না। পাঠক তৈরি করাও জরুরি। এজন্য নিয়মিত পাঠচক্র, সাহিত্যসভা, বইপাঠ প্রতিযোগিতা, কুইজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থীদের পাঠাগরমুখী করার উদ্যোগ নিতে হবে।

স্থানীয়রা আশা করছেন, প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালনা কমিটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতিমনা মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পিয়াইম গণপাঠাগার আবারও পাঠকে মুখর হয়ে উঠবে। কারণ একটি পাঠাগার শুধু বইয়ের সংগ্রহশালা নয়, এটি একটি সমাজের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সচেতনতার কেন্দ্রবিন্দু। পাঠাগার আছে, বইও আছে—এখন প্রয়োজন শুধু পাঠকের পদচারণা।

আপলোডকারীর তথ্য

বাংলার খবর

জনপ্রিয় সংবাদ

লাখাইয়ে করাব ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি মেহেদী হাসান দুলাল গ্রেপ্তার

error:

পাঠাগার আছে, পাঠক নেই; সংকটে মাধবপুরের পিয়াইম গণপাঠাগার

আপডেট সময় ০৬:২৯:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

মোঃ আইয়ুব খান, মাধবপুর (হবিগঞ্জ):

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন ইউনিয়নের পিয়াইম গ্রামে গড়ে ওঠা পিয়াইম গণপাঠাগার একসময় জ্ঞানচর্চা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু বর্তমানে পাঠাগারটিতে বই থাকলেও নেই পর্যাপ্ত পাঠক। ফলে বইপড়ার সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

২০২২ সালে গ্রামের কৃতি সন্তান, অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ড. প্রদীপ রায়হানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় পিয়াইম গণপাঠাগার। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের নিবন্ধনপ্রাপ্ত এই পাঠাগারে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ বই রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সংগ্রহ করা হয়েছে আরও অনেক বই।

পাঠাগারটিতে পর্যাপ্ত চেয়ার, রিডিং টেবিল ও বই সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও পাঠক উপস্থিতি দিন দিন কমছে। পাঠাগারের রেজিস্টার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত তিন মাসে হাতে গোনা কয়েকজন পাঠক বই ইস্যু নিয়েছেন। অধিকাংশ সময় পাঠাগারের পাঠক কক্ষ ফাঁকাই পড়ে থাকে।

পাঠাগারের সম্পাদক ও লাইব্রেরিয়ান মোস্তফা কামাল জানান, পাঠাগার পরিচালনা করতে নিয়মিত ব্যয় বহন করতে হয়। তিনি মাসে ৫ হাজার টাকা সম্মানী পান। এছাড়া পরিচ্ছন্নতা কর্মী আয়েশা আক্তার ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর লিটন রায়ও মাসিক ৫ হাজার টাকা করে সম্মানী পেয়ে থাকেন। ভবন ভাড়া বাবদ ব্যয় হয় ৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মাসিক প্রায় ১৮ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়।

তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠাতা ড. প্রদীপ রায়হান ব্যক্তিগতভাবে নিয়মিত অর্থ সহায়তা করেন। এছাড়া কিছু সংস্কৃতিমনা মানুষও সহযোগিতা করে থাকেন। তাদের সহায়তায় পাঠাগারের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”

স্থানীয়দের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা ও মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার বইপড়ার অভ্যাস কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বিনোদনে বেশি সময় ব্যয় করছে। ফলে বইয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

শিক্ষানুরাগী সারোয়ার রহমান বলেন, “বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই বই পড়তে চায় না। লেখালেখির চর্চাও কমে গেছে। মোবাইল ফোনের কারণে ভাষা, ব্যাকরণ, সাহিত্য, কবিতা ও গল্পচর্চা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এটি একটি জাতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।”

এদিকে সম্প্রতি পাঠাগারের সভাপতি মিজবাহ উদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে সভাপতির পদ শূন্য হয়ে রয়েছে। ১১ সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা কমিটি থাকলেও কমিটির কার্যক্রম আগের মতো সক্রিয় নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়মিত সভা ও পরিকল্পনামূলক কর্মকাণ্ডের অভাবও পাঠাগারের প্রাণচাঞ্চল্য কমিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সাংবাদিক জালাল উদ্দিন লস্কর বলেন, শুধুমাত্র বই সংগ্রহ করলেই পাঠাগার প্রাণবন্ত হয় না। পাঠক তৈরি করাও জরুরি। এজন্য নিয়মিত পাঠচক্র, সাহিত্যসভা, বইপাঠ প্রতিযোগিতা, কুইজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থীদের পাঠাগরমুখী করার উদ্যোগ নিতে হবে।

স্থানীয়রা আশা করছেন, প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালনা কমিটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতিমনা মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পিয়াইম গণপাঠাগার আবারও পাঠকে মুখর হয়ে উঠবে। কারণ একটি পাঠাগার শুধু বইয়ের সংগ্রহশালা নয়, এটি একটি সমাজের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সচেতনতার কেন্দ্রবিন্দু। পাঠাগার আছে, বইও আছে—এখন প্রয়োজন শুধু পাঠকের পদচারণা।