
জালাল উদ্দিন লস্কর, স্টাফ রিপোর্টার
হবিগঞ্জের রঘুনন্দন বনাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে অবাধে বালু উত্তোলন ও মূল্যবান গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের বিরুদ্ধে। এতে বনাঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নীরব ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হবিগঞ্জের মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলার আংশিক পাহাড়ি বনাঞ্চল নিয়ে রঘুনন্দন রেঞ্জ গঠিত। জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এই বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ও গাছপালা রয়েছে। রঘুনন্দন রেঞ্জের অধীনে প্রায় ৪ হাজার ৩৬০ হেক্টর বনভূমি রয়েছে বলে জানা গেছে। মাধবপুর উপজেলার শাহজীবাজার, শাহপুর ও জগদীশপুর এবং চুনারুঘাট উপজেলার শালটিলা বন বিট নিয়ে এই রেঞ্জের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
রঘুনন্দন রেঞ্জের দায়িত্বে রয়েছেন নবাগত ফরেস্ট রেঞ্জার মো. ফয়সাল আলম। শাহপুর বন বিটের দায়িত্বে ফরেস্ট রথীন্দ্র কিশোর রায়, জগদীশপুর বন বিটে ফরেস্ট মো. জহিরুল ইসলাম এবং শালটিলা বন বিটে ফরেস্ট মোহাইমিনুল সানী দায়িত্ব পালন করছেন।
অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, রঘুনন্দন রেঞ্জের আওতাধীন শাহজীবাজার ও শাহপুর এলাকার বিভিন্ন ছড়া থেকে রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন করছে মাধবপুর উপজেলার বাঘাসুরা ও নোয়াপাড়া ইউনিয়নের একটি সংঘবদ্ধ চক্র। একই সঙ্গে বনাঞ্চল থেকে মূল্যবান গাছ কেটে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে করে এসব বালু বনাঞ্চল থেকে বের করে নেওয়া হয়। ট্রাক্টর, ড্রাম ট্রাক, ডায়না, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ ও পাওয়ার ট্রলিসহ বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে বালু পরিবহন করা হয়। পরে এসব বালু বিভিন্ন কোম্পানি, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বনাঞ্চল থেকে গাছ কাটার পর তা মাধবপুরসহ বিভিন্ন এলাকার করাতকলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ চক্রের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি অংশের যোগাযোগ রয়েছে। এ কারণে ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলতে চান না।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন ও গাছ কাটার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি নেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ড চললেও তা বন্ধে দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
শাহপুর বন বিটের ফরেস্ট রথীন্দ্র কিশোর রায়ের বিরুদ্ধে বনাঞ্চল থেকে বালু ও গাছ চুরির ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাদের দাবি, সংঘবদ্ধ চক্রের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে এসব কর্মকাণ্ড চলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রথীন্দ্র কিশোর রায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরেস্ট রথীন্দ্র কিশোর রায় বলেন, বনাঞ্চলের গাছ বা বালু বিক্রি করে তিনি কোনো টাকা নেন না। তিনি বনাঞ্চলে কর্মচারী সংকটের কথাও উল্লেখ করেন। তার দাবি, অন্যান্য বনাঞ্চলের তুলনায় শাহপুর ও শাহজীবাজার বন বিট এলাকায় বালু ও গাছ চুরি কম।
বালু ও গাছ চুরির ঘটনা ঘটলে রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রকে ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে গাছ ও বালুর টাকা নেওয়ার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করেও কোনো লাভ হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রথীন্দ্র কিশোর রায় আরও দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে গাছ ও বালু চুরির ঘটনা ঘটছে। তাকে শাহপুর বন বিট থেকে সরানো সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, এর আগে ২০২২ সালে বাহুবল উপজেলার পুটিজুরী বন বিটে দায়িত্ব পালনের সময় স্থানীয় ত্রিপুরা পল্লীর বাসিন্দাদের সঙ্গে বিরোধসহ তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। বনাঞ্চলের গাছ ও বালু বিক্রির অভিযোগসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও উপকারভোগীদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দেওয়ার কথাও জানা গেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময় জাতীয়, স্থানীয় ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের দাবিও করেছেন স্থানীয়রা।
তবে রঘুনন্দন বনাঞ্চলে বালু উত্তোলন ও গাছ কাটার এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বন কর্মকর্তা বা প্রশাসনের বক্তব্য জানা যায়নি।
পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং গাছ কাটার ফলে মাটির গঠন, বনভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বাংলার খবর ডেস্ক : 























