ঢাকা ০৬:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ভারতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারবেন না শেখ হাসিনা, জানাল মোদি সরকার Logo ৫৫ বিজিবির অভিযানে ৬০ কেজি ভারতীয় গাঁজা জব্দ, জুলাই মাসে উদ্ধার ১৩২ কেজি Logo বাবা অসুস্থ, মা প্রতিবন্ধী: হবিগঞ্জে হামলায় চোখ হারালেন ছাত্রশক্তির নেতা আলিফ Logo হৃদরোগ নাকি বিষাক্ত মদ? লাখাইয়ে ৬ জনের রহস্যমৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য Logo হবিগঞ্জে ৫৫ বিজিবির পৃথক অভিযানে প্রায় ৬৫ লাখ টাকার ভারতীয় অবৈধ পণ্য জব্দ Logo বাহুবলে ইউএনও উজ্জ্বল রায়ের মোবাইল কোর্ট: মাদকবিরোধী অভিযানে দুইজনের কারাদণ্ড Logo বাহুবলে পূর্ব জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তদন্তে গড়িমসি, প্রশ্নের মুখে শিক্ষা বিভাগ Logo নোয়াপাড়া রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন থেকে ছিনতাইকৃত ২ মোবাইল উদ্ধার, আটক ২ Logo মাধবপুরে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফল ৬ আগস্ট Logo হবিগঞ্জে এনসিপির ওপর হামলায় ছাত্রদলের চার নেতা-কর্মীকে শনাক্তের দাবি

পাঠাগার আছে, পাঠক নেই; সংকটে মাধবপুরের পিয়াইম গণপাঠাগার

মোঃ আইয়ুব খান, মাধবপুর (হবিগঞ্জ):

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন ইউনিয়নের পিয়াইম গ্রামে গড়ে ওঠা পিয়াইম গণপাঠাগার একসময় জ্ঞানচর্চা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু বর্তমানে পাঠাগারটিতে বই থাকলেও নেই পর্যাপ্ত পাঠক। ফলে বইপড়ার সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

২০২২ সালে গ্রামের কৃতি সন্তান, অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ড. প্রদীপ রায়হানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় পিয়াইম গণপাঠাগার। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের নিবন্ধনপ্রাপ্ত এই পাঠাগারে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ বই রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সংগ্রহ করা হয়েছে আরও অনেক বই।

পাঠাগারটিতে পর্যাপ্ত চেয়ার, রিডিং টেবিল ও বই সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও পাঠক উপস্থিতি দিন দিন কমছে। পাঠাগারের রেজিস্টার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত তিন মাসে হাতে গোনা কয়েকজন পাঠক বই ইস্যু নিয়েছেন। অধিকাংশ সময় পাঠাগারের পাঠক কক্ষ ফাঁকাই পড়ে থাকে।

পাঠাগারের সম্পাদক ও লাইব্রেরিয়ান মোস্তফা কামাল জানান, পাঠাগার পরিচালনা করতে নিয়মিত ব্যয় বহন করতে হয়। তিনি মাসে ৫ হাজার টাকা সম্মানী পান। এছাড়া পরিচ্ছন্নতা কর্মী আয়েশা আক্তার ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর লিটন রায়ও মাসিক ৫ হাজার টাকা করে সম্মানী পেয়ে থাকেন। ভবন ভাড়া বাবদ ব্যয় হয় ৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মাসিক প্রায় ১৮ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়।

তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠাতা ড. প্রদীপ রায়হান ব্যক্তিগতভাবে নিয়মিত অর্থ সহায়তা করেন। এছাড়া কিছু সংস্কৃতিমনা মানুষও সহযোগিতা করে থাকেন। তাদের সহায়তায় পাঠাগারের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”

স্থানীয়দের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা ও মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার বইপড়ার অভ্যাস কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বিনোদনে বেশি সময় ব্যয় করছে। ফলে বইয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

শিক্ষানুরাগী সারোয়ার রহমান বলেন, “বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই বই পড়তে চায় না। লেখালেখির চর্চাও কমে গেছে। মোবাইল ফোনের কারণে ভাষা, ব্যাকরণ, সাহিত্য, কবিতা ও গল্পচর্চা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এটি একটি জাতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।”

এদিকে সম্প্রতি পাঠাগারের সভাপতি মিজবাহ উদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে সভাপতির পদ শূন্য হয়ে রয়েছে। ১১ সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা কমিটি থাকলেও কমিটির কার্যক্রম আগের মতো সক্রিয় নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়মিত সভা ও পরিকল্পনামূলক কর্মকাণ্ডের অভাবও পাঠাগারের প্রাণচাঞ্চল্য কমিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সাংবাদিক জালাল উদ্দিন লস্কর বলেন, শুধুমাত্র বই সংগ্রহ করলেই পাঠাগার প্রাণবন্ত হয় না। পাঠক তৈরি করাও জরুরি। এজন্য নিয়মিত পাঠচক্র, সাহিত্যসভা, বইপাঠ প্রতিযোগিতা, কুইজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থীদের পাঠাগরমুখী করার উদ্যোগ নিতে হবে।

স্থানীয়রা আশা করছেন, প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালনা কমিটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতিমনা মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পিয়াইম গণপাঠাগার আবারও পাঠকে মুখর হয়ে উঠবে। কারণ একটি পাঠাগার শুধু বইয়ের সংগ্রহশালা নয়, এটি একটি সমাজের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সচেতনতার কেন্দ্রবিন্দু। পাঠাগার আছে, বইও আছে—এখন প্রয়োজন শুধু পাঠকের পদচারণা।

আপলোডকারীর তথ্য

বাংলার খবর

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতে বসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারবেন না শেখ হাসিনা, জানাল মোদি সরকার

error:

পাঠাগার আছে, পাঠক নেই; সংকটে মাধবপুরের পিয়াইম গণপাঠাগার

আপডেট সময় ০৬:২৯:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

মোঃ আইয়ুব খান, মাধবপুর (হবিগঞ্জ):

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন ইউনিয়নের পিয়াইম গ্রামে গড়ে ওঠা পিয়াইম গণপাঠাগার একসময় জ্ঞানচর্চা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু বর্তমানে পাঠাগারটিতে বই থাকলেও নেই পর্যাপ্ত পাঠক। ফলে বইপড়ার সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

২০২২ সালে গ্রামের কৃতি সন্তান, অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ড. প্রদীপ রায়হানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় পিয়াইম গণপাঠাগার। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের নিবন্ধনপ্রাপ্ত এই পাঠাগারে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ বই রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সংগ্রহ করা হয়েছে আরও অনেক বই।

পাঠাগারটিতে পর্যাপ্ত চেয়ার, রিডিং টেবিল ও বই সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও পাঠক উপস্থিতি দিন দিন কমছে। পাঠাগারের রেজিস্টার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত তিন মাসে হাতে গোনা কয়েকজন পাঠক বই ইস্যু নিয়েছেন। অধিকাংশ সময় পাঠাগারের পাঠক কক্ষ ফাঁকাই পড়ে থাকে।

পাঠাগারের সম্পাদক ও লাইব্রেরিয়ান মোস্তফা কামাল জানান, পাঠাগার পরিচালনা করতে নিয়মিত ব্যয় বহন করতে হয়। তিনি মাসে ৫ হাজার টাকা সম্মানী পান। এছাড়া পরিচ্ছন্নতা কর্মী আয়েশা আক্তার ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর লিটন রায়ও মাসিক ৫ হাজার টাকা করে সম্মানী পেয়ে থাকেন। ভবন ভাড়া বাবদ ব্যয় হয় ৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মাসিক প্রায় ১৮ হাজার টাকা এবং বছরে প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়।

তিনি বলেন, “প্রতিষ্ঠাতা ড. প্রদীপ রায়হান ব্যক্তিগতভাবে নিয়মিত অর্থ সহায়তা করেন। এছাড়া কিছু সংস্কৃতিমনা মানুষও সহযোগিতা করে থাকেন। তাদের সহায়তায় পাঠাগারের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”

স্থানীয়দের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা ও মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার বইপড়ার অভ্যাস কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বিনোদনে বেশি সময় ব্যয় করছে। ফলে বইয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

শিক্ষানুরাগী সারোয়ার রহমান বলেন, “বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই বই পড়তে চায় না। লেখালেখির চর্চাও কমে গেছে। মোবাইল ফোনের কারণে ভাষা, ব্যাকরণ, সাহিত্য, কবিতা ও গল্পচর্চা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এটি একটি জাতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।”

এদিকে সম্প্রতি পাঠাগারের সভাপতি মিজবাহ উদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে সভাপতির পদ শূন্য হয়ে রয়েছে। ১১ সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা কমিটি থাকলেও কমিটির কার্যক্রম আগের মতো সক্রিয় নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়মিত সভা ও পরিকল্পনামূলক কর্মকাণ্ডের অভাবও পাঠাগারের প্রাণচাঞ্চল্য কমিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সাংবাদিক জালাল উদ্দিন লস্কর বলেন, শুধুমাত্র বই সংগ্রহ করলেই পাঠাগার প্রাণবন্ত হয় না। পাঠক তৈরি করাও জরুরি। এজন্য নিয়মিত পাঠচক্র, সাহিত্যসভা, বইপাঠ প্রতিযোগিতা, কুইজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম আয়োজন করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থীদের পাঠাগরমুখী করার উদ্যোগ নিতে হবে।

স্থানীয়রা আশা করছেন, প্রতিষ্ঠাতা, পরিচালনা কমিটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতিমনা মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পিয়াইম গণপাঠাগার আবারও পাঠকে মুখর হয়ে উঠবে। কারণ একটি পাঠাগার শুধু বইয়ের সংগ্রহশালা নয়, এটি একটি সমাজের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সচেতনতার কেন্দ্রবিন্দু। পাঠাগার আছে, বইও আছে—এখন প্রয়োজন শুধু পাঠকের পদচারণা।