
জালাল উদ্দিন লস্কর, স্টাফ রিপোর্টার:
একসময় দর্শকের উপচেপড়া ভিড়ে মুখর থাকত সিনেমা হলটি। প্রতিদিন চলত তিনটি শো। দূরদূরান্ত থেকে দলবেঁধে মানুষ আসতেন বাংলা চলচ্চিত্র দেখতে। টিকিট না পেয়ে কখনো বচসা, এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটত। সময়ের পরিবর্তনে সেই জমজমাট দিন এখন শুধুই স্মৃতি। হবিগঞ্জের মাধবপুরের ঐতিহ্যবাহী সোহেল সিনেমা হলটি এখন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের নোয়াপাড়া বাজারের একপ্রান্তে ১৯৮১ সালে সোহেল সিনেমা হলটি প্রতিষ্ঠা করেন তৎকালীন নোয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মরহুম সৈয়দ মো. আলমগীর। প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই এটি স্থানীয় বিনোদনপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
তখন প্রতিদিন নিয়মিত তিনটি শো চলত—ইভনিং, মেটিনি ও নাইট। প্রতিটি শোতেই থাকত দর্শকদের উপচেপড়া ভিড়। সে সময় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও ভিসিআরে সিনেমা দেখার সুযোগ ছাড়া বিনোদনের মাধ্যম ছিল সীমিত। ফলে নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেই দর্শকদের বড় একটি অংশ ছুটে যেত সিনেমা হলে।
শুধু মাধবপুর নয়, পার্শ্ববর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর এবং হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকেও দলবেঁধে দর্শক আসতেন সোহেল সিনেমা হলে। জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র দেখতে অনেকেই আগাম পরিকল্পনা করে সিনেমা হলে আসতেন।
স্থানীয়দের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, সিনেমা হলের সামনে টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি হতো। চাহিদার তুলনায় টিকিট কম থাকায় অনেক সময় টিকিট না পেয়ে দর্শকদের মধ্যে বচসা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটত। পরে হল কর্তৃপক্ষ দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিত।
জানা যায়, প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মো. আলমগীর তার বড় ছেলে এবং বর্তমানে নোয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ আতাউল মোস্তফা সোহেলের নামে সিনেমা হলটির নামকরণ করেন।
দীর্ঘদিন দর্শকদের বিনোদনের চাহিদা পূরণ করলেও সময়ের সঙ্গে সিনেমা হলটির ব্যবসায় ভাটা পড়ে। হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয়তা, বাংলা চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার অভিযোগ এবং ভিসিআর, ভিসিপি ও পরে ডিভিডির সহজলভ্যতার কারণে ধীরে ধীরে দর্শক হলবিমুখ হতে থাকেন। এতে কমতে থাকে সিনেমা হলটির আয়।
একপর্যায়ে লোকসানের বোঝা আর না বাড়াতে ২০০৭ সালে সোহেল সিনেমা হলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বন্ধ হওয়ার প্রায় দুই দশক পরও নোয়াপাড়া বাজারে দাঁড়িয়ে আছে সেই সোহেল সিনেমা হল। সিনেমার পর্দায় এখন আর আলো জ্বলে না, শোনা যায় না প্রজেক্টরের শব্দ কিংবা দর্শকদের হাততালি। তবে পুরোনো ভবনটি আজও বহন করছে মাধবপুরের একটি সময়ের বিনোদন ও সংস্কৃতির স্মৃতি।
স্থানীয় প্রবীণদের কাছে সোহেল সিনেমা হল শুধু একটি সিনেমা হল নয়; এটি তাদের কৈশোর ও তারুণ্যের স্মৃতি, এক সময়ের সামাজিক মিলনস্থল এবং মাধবপুরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলার খবর ডেস্ক : 



















