
জালাল উদ্দিন লস্কর, স্টাফ রিপোর্টার:
একসময় দেশজুড়ে পরিচিত ছিল হবিগঞ্জের মাধবপুরে হাতে তৈরি পানি বিশুদ্ধকরণ ফিল্টার। সিমেন্ট, বালি, কংক্রিট, পাথর, লাইমস্টোন পাউডার ও মোজাইকের বিশেষ মিশ্রণে তৈরি তিন স্তরের এসব ফিল্টার পানি বিশুদ্ধ করার পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে দীর্ঘসময় ঠান্ডা রাখত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তানসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও এসব ফিল্টার রপ্তানি হতো বলে স্থানীয়দের দাবি।
তবে আধুনিক প্লাস্টিক, ফাইবার, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ফিল্টার বাজার দখল করায় হারিয়ে যেতে বসেছে মাধবপুরের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প। একসময় মাধবপুর পৌরসভার কাছারি এলাকা ও আশপাশে ১৫ থেকে ১৭টি কারখানায় দুই শতাধিক শ্রমিক কাজ করলেও বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি কারখানায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন চলছে। কাজের অভাবে অনেক কারিগর পেশা বদলে নিয়েছেন।
স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালে মাধবপুরের হীরালাল রায় হাতে তৈরি বিশেষ ধরনের পানি বিশুদ্ধকরণ ফিল্টার উদ্ভাবন করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতায় এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তিন স্তরের বিশেষ কাঠামোর কারণে পানি ধীরে ধীরে পরিশোধিত হয়ে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা অবস্থায় জমা হতো। একসময় সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসব ফিল্টার সংগ্রহ করতেন। ‘মাধবপুর ফিল্টার’ নামেও এটি পরিচিতি পায়।
কারিগরদের মতে, আধুনিক ফিল্টারের পাশাপাশি কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিও এই শিল্পের সংকট বাড়িয়েছে। সিমেন্ট, বালি, পাথর ও মোজাইকের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজারজাতকরণ সুবিধার অভাবেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন তারা।
স্থানীয় কারিগর বাবু সুরঞ্জন বলেন, “বাবার আমল থেকে ফিল্টার বানাচ্ছি। আগে প্রতিদিন অর্ডার সামলাতে হিমশিম খেতে হতো। এখন সপ্তাহেও একটা অর্ডার পাই না। অনেকে কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।”
মাধবপুর বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী সাদেক মিয়া বলেন, “একসময় এখানকার ফিল্টার দেশের বিভিন্ন জেলায় যেত। এখন স্থানীয়ভাবে অল্প কিছু বিক্রি হয়। সেই রমরমা দিন আর নেই।”
কারিগররা বলছেন, সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক নকশা ও প্রযুক্তির সংযোজন এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা দেওয়া হলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।
মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, “হাতে তৈরি ফিল্টার একসময় মাধবপুরের একটি ব্র্যান্ড ছিল। সময়ের পরিবর্তনে এই শিল্প পিছিয়ে পড়লেও এর সুনাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে কীভাবে সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবিত করা যায়, সে বিষয়ে চিন্তাভাবনার সুযোগ রয়েছে।”
বাংলার খবর ডেস্ক : 



















