ঢাকা ১০:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo হবিগঞ্জে এনসিপির ওপর হামলায় ছাত্রদলের চার নেতা-কর্মীকে শনাক্তের দাবি Logo হবিগঞ্জ ছাত্রদলের সভাপতিসহ শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে এনসিপির মামলা Logo লাখাইয়ে সরকারি বই পাচার মামলার সুরাহা কবে? দুদকের ধীরগতিতে জনমনে চরম ক্ষোভ Logo বাহুবলে আবারও পুলিশের বাধায় এনসিপি Logo পুলিশকে হাসনাত: ‘দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবেন না’ Logo সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী গ্রেপ্তার Logo চট্টগ্রামে এনসিপির কর্মসূচিতে বিএনপি নেতাকর্মীদের বাধা, হাতাহাতি Logo চা বাগানে এমপির প্রচেষ্টায় নতুন ঘর পেল আদিবাসী পরিবার Logo প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য আনারস পাঠালেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী Logo এনসিপি ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে হবিগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি

হবিগঞ্জ-৪ আসন চা-শ্রমিকের ভোট আদায় করতে মরিয়া প্রার্থীরা

হামিদুর রহমান, মাধবপুর (হবিগঞ্জ):

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে নানা অবজ্ঞা ও অবহেলায় দিন কাটছে চা-শ্রমিকদের। বিপ্লবের পর বিপ্লব হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে—কিন্তু চা-শ্রমিকদের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। আজও তারা স্থায়ী বসবাসের জমি থেকে বঞ্চিত, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়নি। সময়ের পর সময় রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও তাদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। তবে ভোট এলেই প্রার্থীরা হাজির হন নানা স্বপ্ন আর প্রতিশ্রুতি নিয়ে।

দীর্ঘ ৫৪ বছরেও চা-শ্রমিকদের জীবনমান কাঙ্ক্ষিতভাবে উন্নত হয়নি। বর্তমানে তারা দৈনিক মাত্র ১৮৭ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত হবিগঞ্জ-৪ আসনে চা-শ্রমিকদের ভোট জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত। এই দুই উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫২ হাজার ৭১১ জন। এর মধ্যে ২২টি চা-বাগানের শ্রমিক ভোট নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অতীতে এ আসনে চা-শ্রমিকদের নিরঙ্কুশ ভোটে নৌকার প্রার্থীরা জয়ী হতেন। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নৌকা প্রতীকবিহীন হওয়ায় চা-শ্রমিকদের ভোট আদায়ে মরিয়া হয়ে উঠেছেন মাঠে থাকা সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা।

চা-শ্রমিকদের ভাষ্য, ভোট এলেই প্রার্থীরা তাদের কাছে ধর্ণা দেন—‘দিদি’, ‘মাসি’ ডেকে মন জয়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেই আর খোঁজ-খবর থাকে না। এ কারণে এবার তারা বুঝে-শুনে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি চা-শ্রমিক ভোটার রয়েছেন। তারা আর অবহেলার পাত্র হয়ে থাকতে চান না। তাদের দাবি—স্থায়ী বাসস্থান, চিকিৎসা, সুশিক্ষা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।

হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট–মাধবপুর) আসনটি চা-বাগান অধ্যুষিত এলাকা। এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, জামায়াতে ইসলামী জোটের প্রার্থীসহ মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটারদের ধারণা, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ মো. ফয়সল, জামায়াতে ইসলামীর জোটভুক্ত খেলাফত মজলিসের প্রার্থী ড. আহমদ আবদুল কাদের এবং ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী আলোচিত বক্তা গিয়াস উদ্দিন আত তাহেরীর মধ্যেই মূল লড়াই হবে।

এছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান চৌধুরী, বাসদের মো. মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের রাশেদুল ইসলাম খোকন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের শাহ মো. আল আমিন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের রেজাউল মোস্তফা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সালেহ আহদ সাজন। নয়জন প্রার্থীই মাঠে সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হবিগঞ্জ-৪ আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে চা-শ্রমিকদের ভোটের মাধ্যমেই।

দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে চা শিল্প। যুগের পর যুগ শ্রম আর ঘামের মাধ্যমে এই শিল্প টিকিয়ে রেখেছেন চা-শ্রমিকরাই। তাই শুধু ভোট নয়, চা শিল্পের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থেও তাদের জীবনমান উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।

চা-শ্রমিক সন্ধ্যা রাণী বলেন, “ভোট দিয়ে কী করব? যারা ভোট নিয়ে আমাদের উন্নয়ন করে না, তাদের ভোট দিয়ে লাভ কী? ভোটের সময় দিদি-মাসি ডেকে অনেক কথা বলে, কিন্তু পরে আর খোঁজ নেয় না। আমাদের শুধু ব্যবহার করা হয়।”

চন্ডিছড়া বাগানের শ্রমিক রাকেশ তাঁতী বলেন, “ভোট এলেই আমাদের কদর বাড়ে, কিন্তু দুর্দশা কাটে না। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর যেভাবে নির্যাতন হচ্ছে, তাতে বেঁচে থাকাও অনিশ্চিত মনে হয়।”

মালতী রাণী বলেন, “ওরা মনে করে আমরা শুধু ভোটের মেশিন। কাজ শেষ হলে কেউ আর জিজ্ঞেসও করে না। এবার কিন্তু লোভ দেখিয়ে আমাদের ভুলানো যাবে না—ভেবে-চিন্তেই ভোট দেব।”

এ বিষয়ে মাধবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শামছুল ইসলাম কামাল বলেন, “ধানের শীষে ভোট দিয়ে জয়ী করলে বিএনপি চেয়ারম্যানের কমিটমেন্ট অনুযায়ী চা-শ্রমিকদের সব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে।”

জামায়াতে ইসলামীর হবিগঞ্জ জেলা আমির মাওলানা মখলিছুর রহমান বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকেই চা-শ্রমিকরা অবহেলিত। জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করলে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

আপলোডকারীর তথ্য

বাংলার খবর

জনপ্রিয় সংবাদ

হবিগঞ্জে এনসিপির ওপর হামলায় ছাত্রদলের চার নেতা-কর্মীকে শনাক্তের দাবি

error:

হবিগঞ্জ-৪ আসন চা-শ্রমিকের ভোট আদায় করতে মরিয়া প্রার্থীরা

আপডেট সময় ০৫:১৬:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

হামিদুর রহমান, মাধবপুর (হবিগঞ্জ):

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে নানা অবজ্ঞা ও অবহেলায় দিন কাটছে চা-শ্রমিকদের। বিপ্লবের পর বিপ্লব হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে—কিন্তু চা-শ্রমিকদের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। আজও তারা স্থায়ী বসবাসের জমি থেকে বঞ্চিত, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়নি। সময়ের পর সময় রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও তাদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। তবে ভোট এলেই প্রার্থীরা হাজির হন নানা স্বপ্ন আর প্রতিশ্রুতি নিয়ে।

দীর্ঘ ৫৪ বছরেও চা-শ্রমিকদের জীবনমান কাঙ্ক্ষিতভাবে উন্নত হয়নি। বর্তমানে তারা দৈনিক মাত্র ১৮৭ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত হবিগঞ্জ-৪ আসনে চা-শ্রমিকদের ভোট জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত। এই দুই উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫২ হাজার ৭১১ জন। এর মধ্যে ২২টি চা-বাগানের শ্রমিক ভোট নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অতীতে এ আসনে চা-শ্রমিকদের নিরঙ্কুশ ভোটে নৌকার প্রার্থীরা জয়ী হতেন। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নৌকা প্রতীকবিহীন হওয়ায় চা-শ্রমিকদের ভোট আদায়ে মরিয়া হয়ে উঠেছেন মাঠে থাকা সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা।

চা-শ্রমিকদের ভাষ্য, ভোট এলেই প্রার্থীরা তাদের কাছে ধর্ণা দেন—‘দিদি’, ‘মাসি’ ডেকে মন জয়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেই আর খোঁজ-খবর থাকে না। এ কারণে এবার তারা বুঝে-শুনে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি চা-শ্রমিক ভোটার রয়েছেন। তারা আর অবহেলার পাত্র হয়ে থাকতে চান না। তাদের দাবি—স্থায়ী বাসস্থান, চিকিৎসা, সুশিক্ষা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।

হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট–মাধবপুর) আসনটি চা-বাগান অধ্যুষিত এলাকা। এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, জামায়াতে ইসলামী জোটের প্রার্থীসহ মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটারদের ধারণা, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ মো. ফয়সল, জামায়াতে ইসলামীর জোটভুক্ত খেলাফত মজলিসের প্রার্থী ড. আহমদ আবদুল কাদের এবং ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী আলোচিত বক্তা গিয়াস উদ্দিন আত তাহেরীর মধ্যেই মূল লড়াই হবে।

এছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান চৌধুরী, বাসদের মো. মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের রাশেদুল ইসলাম খোকন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের শাহ মো. আল আমিন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের রেজাউল মোস্তফা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সালেহ আহদ সাজন। নয়জন প্রার্থীই মাঠে সক্রিয় প্রচারণা চালাচ্ছেন।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হবিগঞ্জ-৪ আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে চা-শ্রমিকদের ভোটের মাধ্যমেই।

দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে চা শিল্প। যুগের পর যুগ শ্রম আর ঘামের মাধ্যমে এই শিল্প টিকিয়ে রেখেছেন চা-শ্রমিকরাই। তাই শুধু ভোট নয়, চা শিল্পের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থেও তাদের জীবনমান উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।

চা-শ্রমিক সন্ধ্যা রাণী বলেন, “ভোট দিয়ে কী করব? যারা ভোট নিয়ে আমাদের উন্নয়ন করে না, তাদের ভোট দিয়ে লাভ কী? ভোটের সময় দিদি-মাসি ডেকে অনেক কথা বলে, কিন্তু পরে আর খোঁজ নেয় না। আমাদের শুধু ব্যবহার করা হয়।”

চন্ডিছড়া বাগানের শ্রমিক রাকেশ তাঁতী বলেন, “ভোট এলেই আমাদের কদর বাড়ে, কিন্তু দুর্দশা কাটে না। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর যেভাবে নির্যাতন হচ্ছে, তাতে বেঁচে থাকাও অনিশ্চিত মনে হয়।”

মালতী রাণী বলেন, “ওরা মনে করে আমরা শুধু ভোটের মেশিন। কাজ শেষ হলে কেউ আর জিজ্ঞেসও করে না। এবার কিন্তু লোভ দেখিয়ে আমাদের ভুলানো যাবে না—ভেবে-চিন্তেই ভোট দেব।”

এ বিষয়ে মাধবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শামছুল ইসলাম কামাল বলেন, “ধানের শীষে ভোট দিয়ে জয়ী করলে বিএনপি চেয়ারম্যানের কমিটমেন্ট অনুযায়ী চা-শ্রমিকদের সব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে।”

জামায়াতে ইসলামীর হবিগঞ্জ জেলা আমির মাওলানা মখলিছুর রহমান বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকেই চা-শ্রমিকরা অবহেলিত। জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করলে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।”