ঢাকা ০৪:৫১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo লাখাইয়ে ১ম শ্রেণির ৬ বছরের ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা, গণধোলাইয়ের পর বখাটে পুলিশে সোপর্দ Logo লাখাইয়ে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী যুবককে ঢিল ছোড়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, পিতা-পুত্রসহ আহত একাধিক Logo লাখাইয়ে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা সুচিত্রা রানী দাশের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের দাবি Logo ৭২ কেজি গাঁজাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার, মাধবপুরে পুলিশের অভিযান Logo গায়ক আসিফ আকবর গ্রেফতার Logo স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে এমপি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সলের সৌজন্য সাক্ষাৎ Logo সীমান্তে অব্যাহত বিএসএফের পুশইনের চেষ্টা, কঠোর অবস্থানে বিজিবি Logo মাধবপুরে সুরমা চা বাগান থেকে অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ উদ্ধার Logo মাধবপুরে চুরির অভিযোগে যুবকের মাথা ন্যাড়া, আঁকা হলো আর্জেন্টিনার পতাকা Logo চুনারুঘাটে বসতঘর থেকে প্রবাসীর স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার, হত্যার অভিযোগ

আনোয়ার সাহেবের অদ্ভুত ট্রেনযাত্রা

জালাল উদ্দীন লস্কর:

কমলাপুর রেল স্টেশনের ওয়েটিং রুমে অলস ভঙ্গিমায় বসে পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছিলেন কামরুল সাহেব। পুরো নাম কামরুল আনোয়ার চৌধুরী। রাত ১০টার সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেসে বাড়ি যাবেন বলে তার এই অপেক্ষা। বরাবরই তিনি রাত ১০টার এই ট্রেনেই বাড়ি যান। ঢাকায় আছেন সাত বছর। সরকারি চাকরি করেন। পদপদবী তেমন না, কম্পিউটার অপারেটর। প্রতিমাসেই বাড়ি যান। এই সাত বছরে রাতের ট্রেনে বাড়ি যাওয়ার এই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি আনোয়ার সাহেবের।

একবার শাশুড়ির মৃত্যুর খবর পেয়ে তড়িঘড়ি করে বাসে গিয়েছিলেন। সে কি বিড়ম্বনাময় এক যাত্রা। যানজটে পথে বাসের মধ্যেই কেটে গিয়েছিল দুই ঘণ্টা। মনে হলে এখনও বিরক্তিতে গা ঘিনঘিনিয়ে উঠে। ট্রেন জার্নিকেই তাই নিরাপদ মনে করেন। আজকাল ট্রেনেও তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। তারপরও রাতের ট্রেনে ভ্রমণ করা কামরুল সাহেবের কাছে নেশার মতো। এক ধরনের মাদকতা অনুভব করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভ্রমণটা তার কখনোই উপভোগ করা হয় না। ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেনের দুলুনিতে ঘুমিয়ে পড়া কামরুল আনোয়ার সাহেবের অনেক পুরনো অভ্যাস।

গমগম করা যাত্রীদের ভিড়, হকারদের হাঁকডাক কোনোকিছুতেই তার ঘুমের ব্যাঘাত হয় না। ছোটবেলায় মরহুম পিতা মনোয়ার হোসেনের সাথে অনেকবার ট্রেনে চট্টগ্রামে গিয়েছেন। সেখানে তার এক ফুফু থাকতেন। তার ফুফা সালাউদ্দিন আহমদ রেলওয়েতে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে মনোয়ার সাহেব বিনা টিকেটেই রেল ভ্রমণের সুযোগ পেতেন। সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে বছরে কয়েকবার চট্টগ্রাম যাওয়া মিস করতেন না।

আনোয়ার সাহেবের ফুফু মারা গেছেন অনেক দিন। বোনের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মনোয়ার সাহেব শেষবারের মতো চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিল ছোট্ট আনোয়ার। ফুফুর মৃত্যুর পর মাস না পার হতেই আনোয়ার সাহেবের ফুফা বাসার কাজকর্মে সহায়তার জন্য রাখা কিশোরী গৃহকর্মী হালিমাকে বিয়ে করেন। এরপর মনোয়ার সাহেব সালাহউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। সালাহউদ্দিনও আর যোগাযোগ রাখার দরকার মনে করেননি। আনোয়ার সাহেবের ফুফুর কোনো সন্তান হয়নি বিয়ের পরের দশ বছরেও।

সালাউদ্দিন মুখে কিছু না বললেও মনে মনে অসন্তুষ্টই ছিলেন স্ত্রী নাসিমা বেগমের প্রতি। তখনও ট্রেন ভ্রমণে আশপাশ-প্রতিবেশ সবকিছু ভুলে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়তো আনোয়ার। আজ এই বয়সেও তার ছোটবেলার সেই অভ্যাসের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

রাত ১০টা বাজতে খুব একটা বাকি নেই আর। কামরুল সাহেব ৭ নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে ত্রস্তপায়ে ছুটছেন। স্টেশনের লাউড স্পিকারে সুকণ্ঠি ঘোষিকার ঘোষণা— “সম্মানিত যাত্রী সাধারণের মনোযোগ আকর্ষণ করে বলছি, সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেস কিছুক্ষণের মধ্যেই সিলেটের উদ্দেশ্যে কমলাপুর ছেড়ে যাবে। বাংলাদেশ রেলওয়েতে আপনাদের ভ্রমণ নিরাপদ ও আনন্দদায়ক হোক।”

সুন্দর বাচনভঙ্গির ঘোষিকার চেহারাটা কল্পনা করেন কামরুল সাহেব। মনে মনে ধরে নেন এই সুকণ্ঠি মহিলা নিশ্চয়ই সুন্দরী হবেন। কখন যে নিজের অজান্তেই আরেকজনের পিঠে ধাক্কা লেগে যায় টেরই পাননি কামরুল আনোয়ার। ভোঁ করে হুইসেল বাজছে। ট্রেন ছেড়ে দেবে এখনই। পড়িমড়ি করে নির্ধারিত কামরায় উঠলেন তিনি। ট্রেন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো। বিমানবন্দর স্টেশন পার হওয়ার পর ট্রেনের গতি বাড়লো। পথে কোনো বড় সমস্যা না হলে কামরুল সাহেবের ছয় ঘণ্টা লাগে গন্তব্যে পৌঁছাতে। শায়েস্তাগঞ্জ জংশনে নামতে হয় তাকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন কামরুল সাহেব। এক হাতে ছোট্ট ট্রাভেল ব্যাগ জড়িয়ে রেখে রীতিমতো নাক ডাকাতে শুরু করেন। ঈদ মৌসুম ছাড়াও এখন ট্রেনে প্রচণ্ড ভিড় থাকে। অনেকে স্ট্যান্ডিং টিকেট কিনে দাঁড়িয়ে যান। প্রচণ্ড গরম। মাথার উপর পাখা ঘুরছে। কামরুল সাহেব ঘুমাচ্ছেন। কখনো পাশের যাত্রীর উপর গিয়েও পড়ছেন। ঘুমের মধ্যেই আবার নিজের জায়গায় ফিরে আসছেন।

অফিসেও সুযোগ পেলেই বসে বসে ঘুমিয়ে নেন তিনি। ভাবেন, এত কাজ করে কি হবে! মাস শেষে বেতন তো ঠিকই থাকছে। তাছাড়া কাজেকর্মে খুব বেশি উৎসাহ পান না। অফিসের অন্য অনেকেরই বাড়তি আয় রোজগার আছে। তার সে সুযোগ নেই। মনে মনে হিংসার আগুনে পোড়েন। সীমিত পয়সায় চলা মুশকিল। নিজের থাকা-খাওয়া, পকেট খরচ, বাড়িতে নিয়মিত টাকা দেওয়া— কিছুতেই কুলায় না।

কতবার বসকে সেকশন পরিবর্তনের অনুরোধ করেছেন। কাজ হয়নি। সরকারি চাকরিতে এমন নিয়ম নেই। তারপরও বসকে খুশি করার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। একসময় পঞ্চাশ হাজার টাকা জোগাড় করে বসকে দেন। কিন্তু তারপরও কোনো প্রমোশন হয়নি। টাকা ফেরতও চাইতে পারেননি। একদিন ইঙ্গিতে টাকা ফেরতের কথা বলতেই উল্টো তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা শোনানো হয়। ভয় পেয়ে যান আনোয়ার সাহেব। অফিস পলিটিক্স সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকায় একেবারে চুপসে যান তিনি।

ঘুমের ঘোরে কামরুল সাহেব এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। মনোরম এক উদ্যানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। চারিদিক ফুলে ফুলে ভরা। নানা রকম ফলের গাছ। ফলভারে নুয়ে আছে। বাতাসে মিষ্টি ঘ্রাণ। হঠাৎ দূর থেকে একটা ছায়ামূর্তি তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলেন। ভয় পেয়ে ঘামতে শুরু করেন। ছায়ামূর্তিটি একসময় তার সামনে এসে দাঁড়ায়।

“ভয় পেয়েছিলে আনোয়ার?”

গলার আওয়াজ শুনেই আঁতকে ওঠেন তিনি। এ যে শিলা। কলেজ জীবনের প্রেমিকা। বহু বছর আগে আত্মহত্যা করেছে সে। শিলা জানায়, ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়েই সে আত্মহত্যা করেছিল। আনোয়ার তাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা দিলেও শেষ পর্যন্ত আসেননি। অপমান, সমাজের কটূক্তি আর পারিবারিক চাপে একসময় নিজেই নিজের জীবন শেষ করে দেয় শিলা।

স্বপ্নে শিলা বলে, “এখানে যে একবার আসে সে আর পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারে না।”

কথা বলতে বলতে একসময় একটি অদ্ভুত সুন্দর ফুল এনে আনোয়ারের হাতে দেয় শিলা। তারপর হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

হঠাৎ এক যাত্রীর ধমক আর ট্রেনের ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে যায় কামরুল সাহেবের। বুঝতে পারেন ট্রেন আখাউড়া জংশনে দাঁড়িয়ে আছে। পরে আবার যাত্রা শুরু করে ট্রেন। শায়েস্তাগঞ্জ পৌঁছে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ভোরে সিএনজিতে করে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি।

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আনোয়ার সাহেবের মনে আজ অদ্ভুত এক অস্থিরতা। স্ত্রী মুনিয়া, ছেলে আহাদ, মেয়ে অনামিকার কথা বারবার মনে পড়ছে। অথচ বাস্তবে স্ত্রীর প্রতি তার টান খুব একটা ছিল না। সংসার করেছেন দায়িত্ববোধ থেকে। কিন্তু মনের ভেতর সবসময়ই বেঁচে ছিল শিলা।

গ্রামের কাছে পৌঁছাতেই মসজিদের মাইক থেকে শোক সংবাদ ভেসে আসতে থাকে। করিমপুর সড়ক বাজারে নেমে প্রতিদিনের মতো মাসুকের চায়ের দোকানে ঢোকেন তিনি। সেখানে দেখা হয় সামাদ জমাদারের সঙ্গে। সামাদের আচরণে কেমন যেন অস্বাভাবিকতা টের পান আনোয়ার সাহেব। দ্রুত বাড়ির দিকে রওনা দেন।

বাড়িতে পৌঁছে দেখেন মানুষের ভিড়। পরে জানতে পারেন, মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে চিৎকার শুরু করেন তার স্ত্রী মুনিয়া। তিনি বারবার বলতে থাকেন, এক সুন্দরী মহিলা তার গলা টিপে ধরছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। পরিবারের লোকজন তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও একসময় নিথর হয়ে পড়েন মুনিয়া। পরে সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা হয় তার মরদেহ।

ঘটনা শুনে স্তম্ভিত হয়ে যান কামরুল আনোয়ার। তার মনে হতে থাকে, স্বপ্নে দেখা সেই শিলাই হয়তো মুনিয়াকে মেরে ফেলেছে।

চাচাতো ভাই মনোয়ার যখন লাশ দাফনের প্রস্তুতির কথা বলছিলেন, তখন হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন কামরুল সাহেব।

“তুমি এমন নিষ্ঠুর হলে কেমন করে শিলা? শিলা, তুমি এমন করতে পারলে?”

তার কথা শুনে উপস্থিত লোকজন একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকেন। কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

আপলোডকারীর তথ্য

বাংলার খবর

জনপ্রিয় সংবাদ

লাখাইয়ে ১ম শ্রেণির ৬ বছরের ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা, গণধোলাইয়ের পর বখাটে পুলিশে সোপর্দ

আনোয়ার সাহেবের অদ্ভুত ট্রেনযাত্রা

আপডেট সময় ০৬:২৫:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬

জালাল উদ্দীন লস্কর:

কমলাপুর রেল স্টেশনের ওয়েটিং রুমে অলস ভঙ্গিমায় বসে পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছিলেন কামরুল সাহেব। পুরো নাম কামরুল আনোয়ার চৌধুরী। রাত ১০টার সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেসে বাড়ি যাবেন বলে তার এই অপেক্ষা। বরাবরই তিনি রাত ১০টার এই ট্রেনেই বাড়ি যান। ঢাকায় আছেন সাত বছর। সরকারি চাকরি করেন। পদপদবী তেমন না, কম্পিউটার অপারেটর। প্রতিমাসেই বাড়ি যান। এই সাত বছরে রাতের ট্রেনে বাড়ি যাওয়ার এই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি আনোয়ার সাহেবের।

একবার শাশুড়ির মৃত্যুর খবর পেয়ে তড়িঘড়ি করে বাসে গিয়েছিলেন। সে কি বিড়ম্বনাময় এক যাত্রা। যানজটে পথে বাসের মধ্যেই কেটে গিয়েছিল দুই ঘণ্টা। মনে হলে এখনও বিরক্তিতে গা ঘিনঘিনিয়ে উঠে। ট্রেন জার্নিকেই তাই নিরাপদ মনে করেন। আজকাল ট্রেনেও তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। তারপরও রাতের ট্রেনে ভ্রমণ করা কামরুল সাহেবের কাছে নেশার মতো। এক ধরনের মাদকতা অনুভব করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভ্রমণটা তার কখনোই উপভোগ করা হয় না। ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেনের দুলুনিতে ঘুমিয়ে পড়া কামরুল আনোয়ার সাহেবের অনেক পুরনো অভ্যাস।

গমগম করা যাত্রীদের ভিড়, হকারদের হাঁকডাক কোনোকিছুতেই তার ঘুমের ব্যাঘাত হয় না। ছোটবেলায় মরহুম পিতা মনোয়ার হোসেনের সাথে অনেকবার ট্রেনে চট্টগ্রামে গিয়েছেন। সেখানে তার এক ফুফু থাকতেন। তার ফুফা সালাউদ্দিন আহমদ রেলওয়েতে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে মনোয়ার সাহেব বিনা টিকেটেই রেল ভ্রমণের সুযোগ পেতেন। সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে বছরে কয়েকবার চট্টগ্রাম যাওয়া মিস করতেন না।

আনোয়ার সাহেবের ফুফু মারা গেছেন অনেক দিন। বোনের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মনোয়ার সাহেব শেষবারের মতো চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিল ছোট্ট আনোয়ার। ফুফুর মৃত্যুর পর মাস না পার হতেই আনোয়ার সাহেবের ফুফা বাসার কাজকর্মে সহায়তার জন্য রাখা কিশোরী গৃহকর্মী হালিমাকে বিয়ে করেন। এরপর মনোয়ার সাহেব সালাহউদ্দিনের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। সালাহউদ্দিনও আর যোগাযোগ রাখার দরকার মনে করেননি। আনোয়ার সাহেবের ফুফুর কোনো সন্তান হয়নি বিয়ের পরের দশ বছরেও।

সালাউদ্দিন মুখে কিছু না বললেও মনে মনে অসন্তুষ্টই ছিলেন স্ত্রী নাসিমা বেগমের প্রতি। তখনও ট্রেন ভ্রমণে আশপাশ-প্রতিবেশ সবকিছু ভুলে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়তো আনোয়ার। আজ এই বয়সেও তার ছোটবেলার সেই অভ্যাসের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

রাত ১০টা বাজতে খুব একটা বাকি নেই আর। কামরুল সাহেব ৭ নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে ত্রস্তপায়ে ছুটছেন। স্টেশনের লাউড স্পিকারে সুকণ্ঠি ঘোষিকার ঘোষণা— “সম্মানিত যাত্রী সাধারণের মনোযোগ আকর্ষণ করে বলছি, সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেস কিছুক্ষণের মধ্যেই সিলেটের উদ্দেশ্যে কমলাপুর ছেড়ে যাবে। বাংলাদেশ রেলওয়েতে আপনাদের ভ্রমণ নিরাপদ ও আনন্দদায়ক হোক।”

সুন্দর বাচনভঙ্গির ঘোষিকার চেহারাটা কল্পনা করেন কামরুল সাহেব। মনে মনে ধরে নেন এই সুকণ্ঠি মহিলা নিশ্চয়ই সুন্দরী হবেন। কখন যে নিজের অজান্তেই আরেকজনের পিঠে ধাক্কা লেগে যায় টেরই পাননি কামরুল আনোয়ার। ভোঁ করে হুইসেল বাজছে। ট্রেন ছেড়ে দেবে এখনই। পড়িমড়ি করে নির্ধারিত কামরায় উঠলেন তিনি। ট্রেন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো। বিমানবন্দর স্টেশন পার হওয়ার পর ট্রেনের গতি বাড়লো। পথে কোনো বড় সমস্যা না হলে কামরুল সাহেবের ছয় ঘণ্টা লাগে গন্তব্যে পৌঁছাতে। শায়েস্তাগঞ্জ জংশনে নামতে হয় তাকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন কামরুল সাহেব। এক হাতে ছোট্ট ট্রাভেল ব্যাগ জড়িয়ে রেখে রীতিমতো নাক ডাকাতে শুরু করেন। ঈদ মৌসুম ছাড়াও এখন ট্রেনে প্রচণ্ড ভিড় থাকে। অনেকে স্ট্যান্ডিং টিকেট কিনে দাঁড়িয়ে যান। প্রচণ্ড গরম। মাথার উপর পাখা ঘুরছে। কামরুল সাহেব ঘুমাচ্ছেন। কখনো পাশের যাত্রীর উপর গিয়েও পড়ছেন। ঘুমের মধ্যেই আবার নিজের জায়গায় ফিরে আসছেন।

অফিসেও সুযোগ পেলেই বসে বসে ঘুমিয়ে নেন তিনি। ভাবেন, এত কাজ করে কি হবে! মাস শেষে বেতন তো ঠিকই থাকছে। তাছাড়া কাজেকর্মে খুব বেশি উৎসাহ পান না। অফিসের অন্য অনেকেরই বাড়তি আয় রোজগার আছে। তার সে সুযোগ নেই। মনে মনে হিংসার আগুনে পোড়েন। সীমিত পয়সায় চলা মুশকিল। নিজের থাকা-খাওয়া, পকেট খরচ, বাড়িতে নিয়মিত টাকা দেওয়া— কিছুতেই কুলায় না।

কতবার বসকে সেকশন পরিবর্তনের অনুরোধ করেছেন। কাজ হয়নি। সরকারি চাকরিতে এমন নিয়ম নেই। তারপরও বসকে খুশি করার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। একসময় পঞ্চাশ হাজার টাকা জোগাড় করে বসকে দেন। কিন্তু তারপরও কোনো প্রমোশন হয়নি। টাকা ফেরতও চাইতে পারেননি। একদিন ইঙ্গিতে টাকা ফেরতের কথা বলতেই উল্টো তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা শোনানো হয়। ভয় পেয়ে যান আনোয়ার সাহেব। অফিস পলিটিক্স সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকায় একেবারে চুপসে যান তিনি।

ঘুমের ঘোরে কামরুল সাহেব এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। মনোরম এক উদ্যানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। চারিদিক ফুলে ফুলে ভরা। নানা রকম ফলের গাছ। ফলভারে নুয়ে আছে। বাতাসে মিষ্টি ঘ্রাণ। হঠাৎ দূর থেকে একটা ছায়ামূর্তি তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলেন। ভয় পেয়ে ঘামতে শুরু করেন। ছায়ামূর্তিটি একসময় তার সামনে এসে দাঁড়ায়।

“ভয় পেয়েছিলে আনোয়ার?”

গলার আওয়াজ শুনেই আঁতকে ওঠেন তিনি। এ যে শিলা। কলেজ জীবনের প্রেমিকা। বহু বছর আগে আত্মহত্যা করেছে সে। শিলা জানায়, ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়েই সে আত্মহত্যা করেছিল। আনোয়ার তাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা দিলেও শেষ পর্যন্ত আসেননি। অপমান, সমাজের কটূক্তি আর পারিবারিক চাপে একসময় নিজেই নিজের জীবন শেষ করে দেয় শিলা।

স্বপ্নে শিলা বলে, “এখানে যে একবার আসে সে আর পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারে না।”

কথা বলতে বলতে একসময় একটি অদ্ভুত সুন্দর ফুল এনে আনোয়ারের হাতে দেয় শিলা। তারপর হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

হঠাৎ এক যাত্রীর ধমক আর ট্রেনের ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে যায় কামরুল সাহেবের। বুঝতে পারেন ট্রেন আখাউড়া জংশনে দাঁড়িয়ে আছে। পরে আবার যাত্রা শুরু করে ট্রেন। শায়েস্তাগঞ্জ পৌঁছে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ভোরে সিএনজিতে করে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি।

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আনোয়ার সাহেবের মনে আজ অদ্ভুত এক অস্থিরতা। স্ত্রী মুনিয়া, ছেলে আহাদ, মেয়ে অনামিকার কথা বারবার মনে পড়ছে। অথচ বাস্তবে স্ত্রীর প্রতি তার টান খুব একটা ছিল না। সংসার করেছেন দায়িত্ববোধ থেকে। কিন্তু মনের ভেতর সবসময়ই বেঁচে ছিল শিলা।

গ্রামের কাছে পৌঁছাতেই মসজিদের মাইক থেকে শোক সংবাদ ভেসে আসতে থাকে। করিমপুর সড়ক বাজারে নেমে প্রতিদিনের মতো মাসুকের চায়ের দোকানে ঢোকেন তিনি। সেখানে দেখা হয় সামাদ জমাদারের সঙ্গে। সামাদের আচরণে কেমন যেন অস্বাভাবিকতা টের পান আনোয়ার সাহেব। দ্রুত বাড়ির দিকে রওনা দেন।

বাড়িতে পৌঁছে দেখেন মানুষের ভিড়। পরে জানতে পারেন, মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে চিৎকার শুরু করেন তার স্ত্রী মুনিয়া। তিনি বারবার বলতে থাকেন, এক সুন্দরী মহিলা তার গলা টিপে ধরছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। পরিবারের লোকজন তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও একসময় নিথর হয়ে পড়েন মুনিয়া। পরে সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা হয় তার মরদেহ।

ঘটনা শুনে স্তম্ভিত হয়ে যান কামরুল আনোয়ার। তার মনে হতে থাকে, স্বপ্নে দেখা সেই শিলাই হয়তো মুনিয়াকে মেরে ফেলেছে।

চাচাতো ভাই মনোয়ার যখন লাশ দাফনের প্রস্তুতির কথা বলছিলেন, তখন হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন কামরুল সাহেব।

“তুমি এমন নিষ্ঠুর হলে কেমন করে শিলা? শিলা, তুমি এমন করতে পারলে?”

তার কথা শুনে উপস্থিত লোকজন একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকেন। কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারছিলেন না।