
- মো. আইয়ুব খান, মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি: প্রতিদিন সকাল হলেই শ্রমিকদের হাঁকডাক, লাইন চৌকিদারের ঘোষণা আর কারখানার যন্ত্রপাতির শব্দে মুখর হয়ে উঠত চা বাগানগুলো। কিন্তু সেই চিরচেনা পরিবেশ এখন নেই। সাপ্তাহিক মজুরি না পেয়ে কর্মবিরতি পালন করছেন হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের পাঁচটি চা বাগানের শ্রমিকেরা। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বকেয়া মজুরি পরিশোধ কিংবা বাগানগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরুর কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। এতে হাজারো শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
কর্মবিরতির কারণে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া, চুনারুঘাটের লালচান্দ ও দেউন্দি এবং মৌলভীবাজারের মিরতিংগাসহ পাঁচটি চা বাগানে নীরবতা বিরাজ করছে।
বুধবার শ্রমিক নেতারা লালচান্দ চা বাগানে সমাবেশ করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। সমস্যা সমাধানে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। এরপরও দাবি পূরণ না হলে ঢাকায় গিয়ে সচিবালয় ঘেরাও করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
বাগান কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, একসময় তাঁদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল। তবে ২০২১ সালে করোনাকাল থেকে বাগানগুলোতে সংকট শুরু হয়। চার বছর আগে লালচান্দ চা বাগানের কারখানা আগুনে পুড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়। দুই বছর আগে নোয়াপাড়া চা বাগানের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় কারখানায় চা প্রক্রিয়াজাত করাও সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া চা উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার, যন্ত্রপাতি ও পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে চায়ের দাম বাড়েনি বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। ফলে বছরের পর বছর লোকসান গুনতে হচ্ছে বাগানগুলোকে। ব্যাংক থেকেও প্রত্যাশিত ঋণ পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে বাগান চালু রাখার চেষ্টা করলেও আর্থিক সংকটের কারণে সময়মতো শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে কর্মবিরতির কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন চা শ্রমিকেরা। সপ্তাহ শেষে দৈনিক ১৭৮ টাকা হাজিরার পাশাপাশি তাঁরা সাড়ে তিন কেজি চাল-আটা পেতেন। এই আয় ও খাদ্যসামগ্রী দিয়েই কোনো রকমে সংসার চালাতেন অনেকে। বহু পরিবারের আয়ের বিকল্প উৎস নেই। বাগানগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শত শত শ্রমিক পরিবার মানবিক সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হঠাৎ করে এত শ্রমিকের পক্ষে বাগানের বাইরে বিকল্প কাজ খুঁজে পাওয়াও কঠিন।
নোয়াপাড়া চা বাগানের সভাপতি কমেড নায়েক বলেন, “বাগানের শ্রমিকেরা কাজ করতে আগ্রহী। কিন্তু মালিকপক্ষ বাগান পরিচালনা করতে পারছে না। এতে শ্রমিকেরা বিপদে পড়েছেন। এ বড় সমস্যা সমাধানে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। বাগান বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ শ্রমিকেরা মানবিক সংকটে পড়বেন।”
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, “পাঁচটি চা বাগানের চলমান সমস্যা সমাধানে মালিকপক্ষ ও সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় হাজারো শ্রমিক চরম সংকটে পড়বেন।”
দেউন্দি কোম্পানির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) রিয়াজ রহমান বলেন, “সমস্যা সমাধানে আমরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছি। ইচ্ছাকৃতভাবে আমরা কোনো সমস্যা তৈরি করিনি। সংকট নিরসনে কাজ করে যাচ্ছি।”
শ্রীমঙ্গল শ্রম অধিদপ্তরের উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন বলেন, গত সোমবার থেকে পাঁচটি চা বাগানে কাজ বন্ধ রয়েছে। শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিক নেতা ও মালিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে।
বাংলার খবর ডেস্ক : 



















