ঢাকা ০৬:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo মাধবপুরে এসআরবি-৯-এর অভিযানে ২৫ কেজি গাঁজা উদ্ধার Logo মাধবপুরে ৮ হাজার তালবীজ রোপণ সফল সমাপ্তি ঘোষণা! Logo ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ, রাজ্যসভার সদস্যপদও ছাড়লেন Logo টেস্টে বিশ্ব রেকর্ড গড়লেন লিটন দাস, এক ম্যাচে দুই ফিফটির সঙ্গে ৯ ডিসমিসাল Logo ৩৫ বছর বয়সের পর আইনজীবী হওয়ার সুযোগ বন্ধের পরিকল্পনা, জানালেন আইনমন্ত্রী Logo মাধবপুরে সরকারি মাঠের ৩টি আকাশমনি গাছ কাটার অভিযোগ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে, তদন্ত কমিটি গঠন Logo মাধবপুরে ১১০ বছর বয়সেও মানুষের শেষ ঠিকানার কারিগর সমসু মিয়া Logo মাধবপুরে ১১৯ পূজামণ্ডপে ৭১ টন ৪০০ কেজি চাল বরাদ্দ, জানালেন এমপি ফয়সল Logo লাখাইয়ে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত Logo দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় সারাদেশে ১০ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন

মাধবপুরের ৭৭ স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই, ৬৪ সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য

জালাল উদ্দিন লস্কর, স্টাফ রিপোর্টার
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। উপজেলার ১৪৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৭টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ এবং ৬৪টি সহকারী শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক ছাড়াই প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চালিয়ে নিতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ছে এবং শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিস ও বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাধবপুর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মোট ১৪১টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকের ৭৭টি এবং সহকারী শিক্ষকের ৬৪টি পদ খালি। প্রধান শিক্ষকের শূন্য থাকা বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৩৪টিতে চলতি দায়িত্বে এবং ৪৩টিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
শিক্ষক সংকটের প্রকট চিত্র দেখা গেছে উপজেলার ছাতিয়াইন ইউনিয়নের রামেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে ২২৯ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুজন। বিদ্যালয়টির ছয়টি অনুমোদিত পদের মধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ চারটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহিতোষ চন্দ্র সূত্রধর বলেন, দুইজন শিক্ষক দিয়ে ছয়টি শ্রেণির পাঠদান চালিয়ে নিতে হচ্ছে। কোনো শিক্ষক ছুটিতে গেলে কিংবা প্রশিক্ষণ বা সভায় অংশ নিতে হলে একজন শিক্ষককেই পুরো বিদ্যালয়ের দায়িত্ব সামলাতে হয়। এতে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি জানান, ২০১৮ সালের মার্চ থেকে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। পরবর্তীতে কয়েকজন সহকারী শিক্ষক বদলি হয়ে যাওয়া ও চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কারণে শিক্ষক সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে বুল্লা ইউনিয়নের মাঝিশ্বাইর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। বিদ্যালয়টির ছয়টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে সরকারি শিক্ষক রয়েছেন মাত্র একজন। পাঠদান সচল রাখতে অন্য বিদ্যালয় থেকে দুজন শিক্ষককে প্রেষণে এনে দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। বিদ্যালয় সূত্র জানায়, বদলি, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা ও ছুটির কারণে সেখানে শিক্ষক সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, শিক্ষক বদলি হওয়ার পর শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে শিশুদের শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মাধবপুর উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি হেফজুর রহমান বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত নতুন শিক্ষক নিয়োগ ছাড়া এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
সমিতির সভাপতি হারুনুর রশিদ মহালদার বলেন, একটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকলে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমই নয়, শিক্ষার গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এত বিপুলসংখ্যক প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ কবির হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে। তবে শিক্ষক সংকটের কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক এনে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সদ্য বদলির আদেশ পাওয়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম জাকিরুল হাসান বলেন, নতুন শিক্ষক নিয়োগ হলে সংকট অনেকাংশে কেটে যাবে। বিষয়টি নিয়মিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে।
শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন মহলের মতে, প্রাথমিক শিক্ষাই একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের মূল ভিত্তি। কিন্তু শিক্ষক সংকটের কারণে মাধবপুর উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে শ্রেণিভিত্তিক পাঠদান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ না হলে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা, পরীক্ষার ফলাফল এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাথমিক শিক্ষার ভিত আরও শক্তিশালী করতে দ্রুত শিক্ষক সংকট নিরসন এবং দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা প্রধান ও সহকারী শিক্ষকের পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টরা।

জনপ্রিয় সংবাদ

মাধবপুরে এসআরবি-৯-এর অভিযানে ২৫ কেজি গাঁজা উদ্ধার

error:

মাধবপুরের ৭৭ স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই, ৬৪ সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য

আপডেট সময় ০৬:২৭:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬

জালাল উদ্দিন লস্কর, স্টাফ রিপোর্টার
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। উপজেলার ১৪৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৭টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ এবং ৬৪টি সহকারী শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক ছাড়াই প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চালিয়ে নিতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ছে এবং শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিস ও বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাধবপুর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মোট ১৪১টি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকের ৭৭টি এবং সহকারী শিক্ষকের ৬৪টি পদ খালি। প্রধান শিক্ষকের শূন্য থাকা বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৩৪টিতে চলতি দায়িত্বে এবং ৪৩টিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
শিক্ষক সংকটের প্রকট চিত্র দেখা গেছে উপজেলার ছাতিয়াইন ইউনিয়নের রামেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে ২২৯ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র দুজন। বিদ্যালয়টির ছয়টি অনুমোদিত পদের মধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ চারটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহিতোষ চন্দ্র সূত্রধর বলেন, দুইজন শিক্ষক দিয়ে ছয়টি শ্রেণির পাঠদান চালিয়ে নিতে হচ্ছে। কোনো শিক্ষক ছুটিতে গেলে কিংবা প্রশিক্ষণ বা সভায় অংশ নিতে হলে একজন শিক্ষককেই পুরো বিদ্যালয়ের দায়িত্ব সামলাতে হয়। এতে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি জানান, ২০১৮ সালের মার্চ থেকে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। পরবর্তীতে কয়েকজন সহকারী শিক্ষক বদলি হয়ে যাওয়া ও চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কারণে শিক্ষক সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে বুল্লা ইউনিয়নের মাঝিশ্বাইর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। বিদ্যালয়টির ছয়টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে সরকারি শিক্ষক রয়েছেন মাত্র একজন। পাঠদান সচল রাখতে অন্য বিদ্যালয় থেকে দুজন শিক্ষককে প্রেষণে এনে দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। বিদ্যালয় সূত্র জানায়, বদলি, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা ও ছুটির কারণে সেখানে শিক্ষক সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, শিক্ষক বদলি হওয়ার পর শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে শিশুদের শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মাধবপুর উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি হেফজুর রহমান বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত নতুন শিক্ষক নিয়োগ ছাড়া এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
সমিতির সভাপতি হারুনুর রশিদ মহালদার বলেন, একটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকলে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমই নয়, শিক্ষার গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এত বিপুলসংখ্যক প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ কবির হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে। তবে শিক্ষক সংকটের কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক এনে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সদ্য বদলির আদেশ পাওয়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম জাকিরুল হাসান বলেন, নতুন শিক্ষক নিয়োগ হলে সংকট অনেকাংশে কেটে যাবে। বিষয়টি নিয়মিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে।
শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন মহলের মতে, প্রাথমিক শিক্ষাই একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের মূল ভিত্তি। কিন্তু শিক্ষক সংকটের কারণে মাধবপুর উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে শ্রেণিভিত্তিক পাঠদান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ না হলে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা, পরীক্ষার ফলাফল এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাথমিক শিক্ষার ভিত আরও শক্তিশালী করতে দ্রুত শিক্ষক সংকট নিরসন এবং দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা প্রধান ও সহকারী শিক্ষকের পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টরা।