
জালাল উদ্দিন লস্কর
একজন শিক্ষক কি শুধু বইয়ের পাঠ পড়িয়ে দেন? নাকি তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তার জগৎ তৈরি করেন?
প্রশ্নটি সহজ, কিন্তু এর উত্তর গভীর। কারণ একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, মূল্যবোধ, যুক্তিবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
William Arthur Ward-এর বহুল উদ্ধৃত কথাটি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—“The mediocre teacher tells. The good teacher explains. The superior teacher demonstrates. The great teacher inspires.”
অর্থাৎ, সাধারণ শিক্ষক শুধু বলেন, ভালো শিক্ষক ব্যাখ্যা করেন, উৎকৃষ্ট শিক্ষক করে দেখান; আর মহান শিক্ষক অনুপ্রেরণা দেন।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শুধু শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখাচ্ছে, নাকি শুধু মুখস্থ করতে শেখাচ্ছে?
মুখস্থবিদ্যার দৌড়
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বহু বছর ধরেই পরীক্ষার নম্বরকে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। ফলে শিক্ষার্থীর সামনে তৈরি হয় এক ধরনের অদৃশ্য চাপ—যত বেশি মুখস্থ করা যাবে, তত ভালো ফল করা যাবে।
কোনো প্রশ্নের উত্তর নিজের ভাষায় বোঝানোর চেয়ে বইয়ের ভাষা হুবহু মনে রাখা যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অথচ শিক্ষা তো মুখস্থ করার প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা নয়।
একজন শিক্ষার্থী একটি সংজ্ঞা মুখস্থ বলতে পারলেই কি সে বিষয়টি বুঝেছে? একটি সূত্র মুখস্থ করতে পারলেই কি সে বাস্তব জীবনে সেটি প্রয়োগ করতে পারবে? একটি রচনা মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারলেই কি তার ভাষা ও চিন্তার বিকাশ ঘটেছে?
উত্তর নিশ্চয়ই ‘হ্যাঁ’ নয়।
Albert Einstein-এর নামে প্রচলিত একটি বিখ্যাত উক্তি—“Education is not the learning of facts, but the training of the mind to think.”
শিক্ষা শুধু তথ্য শেখার বিষয় নয়; বরং মনকে চিন্তা করতে শেখানোর প্রক্রিয়া।
অথচ আমরা অনেক সময় এমন শিক্ষার্থী তৈরি করছি, যারা পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে ফেলছে; কিন্তু কেন এমন হলো, এর পেছনে কী কারণ, অন্য কোনো সমাধান সম্ভব কি না—এসব নিয়ে ভাবার সুযোগ পাচ্ছে না।
প্রশ্ন করার অধিকার
একজন ভালো শিক্ষক শুধু উত্তর দেন না, প্রশ্ন করতে শেখান।
একজন শিক্ষার্থী যখন জিজ্ঞেস করে, “কেন?”, তখন শিক্ষক বিরক্ত না হয়ে যদি বলেন, “চলো, বিষয়টি খুঁজে দেখি”—সেখানেই শুরু হয় প্রকৃত শিক্ষা।
প্রশ্ন থামিয়ে দেওয়া মানে চিন্তার দরজা বন্ধ করে দেওয়া। শিক্ষার্থী ভুল উত্তর দিতে পারে, তার ধারণা ভুল হতে পারে, এমনকি সে শিক্ষককে প্রশ্নও করতে পারে। কিন্তু সেই ভুল বা প্রশ্নকে নিরুৎসাহিত করা হলে শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে নিজের চিন্তা প্রকাশের সাহস হারিয়ে ফেলে।
একজন আদর্শ শিক্ষক তাই এমন পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে শিক্ষার্থী বলতে পারে—“আমি জানি না”, “আমি একমত নই”, “আমি অন্যভাবে ভাবছি।”
কারণ ভিন্নভাবে ভাবার ক্ষমতাই সৃজনশীলতার ভিত্তি।
শিক্ষক সব উত্তর দেবেন না
আজকের পৃথিবীতে তথ্যের অভাব নেই। মুঠোফোন ও ইন্টারনেটের কারণে মুহূর্তেই অসংখ্য তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু তথ্য পাওয়া আর জ্ঞান অর্জন এক বিষয় নয়।
বরং এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—কোন তথ্য সঠিক, কোনটি ভুল এবং কোনটি যাচাই করা প্রয়োজন—তা বোঝার সক্ষমতা।
এখানেই শিক্ষকের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীকে শুধু বলেন, “এটা মুখস্থ করো”, তাহলে তিনি হয়তো পরীক্ষার প্রস্তুতি দিচ্ছেন। কিন্তু যদি বলেন, “এটা কেন সত্য, যুক্তি দিয়ে বোঝাও”, তাহলে তিনি একজন চিন্তাশীল মানুষ তৈরি করছেন।
একজন মহান শিক্ষক সব প্রশ্নের উত্তর জানেন—এমন নয়। বরং তিনি কখনো বলতে পারেন, “আমি জানি না, আমরা একসঙ্গে খুঁজে দেখি।”
এই ‘একসঙ্গে খুঁজে দেখা’র মধ্যেই শিক্ষার সৌন্দর্য।
নম্বরের চেয়ে মানুষ
শিক্ষার সাফল্য শুধু জিপিএ বা পরীক্ষার নম্বরে মাপা যায় না।
একজন শিক্ষার্থী কতটা সৎ, কতটা দায়িত্বশীল, কতটা মানবিক, ভিন্নমতকে কতটা সম্মান করে, অন্যের বিপদে কতটা পাশে দাঁড়ায়—এসবও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল।
Martin Luther King Jr. বলেছেন, “The function of education is to teach one to think intensively and to think critically.”
অর্থাৎ, শিক্ষার অন্যতম কাজ হলো গভীরভাবে ও যুক্তিসংগতভাবে চিন্তা করতে শেখানো।
আমাদের এমন শিক্ষা দরকার, যা একজন শিক্ষার্থীকে শুধু ভালো ফল করার জন্য নয়, ভালো মানুষ হওয়ার জন্যও প্রস্তুত করবে।
কারণ একজন ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা সাংবাদিক হিসেবে সফল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—সে মানুষ হিসেবে কেমন।
বদলাতে হবে শ্রেণিকক্ষের সংস্কৃতি
শিক্ষক দিবসে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকেও তাকাতে হবে।
শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করানো নয়; তাকে বাস্তব সমস্যা নিয়ে ভাবতে দিতে হবে। বিতর্ক করতে দিতে হবে। প্রশ্ন করতে দিতে হবে। ভুল করতে দিতে হবে। নিজের ভাষায় উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
একটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক যদি ৪০ মিনিট একটানা কথা বলেন আর শিক্ষার্থীরা শুধু শুনে যায়, সেখানে পাঠদান হতে পারে; কিন্তু সবসময় শিক্ষা হয় না।
শিক্ষা তখনই প্রাণবন্ত হয়, যখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী দুজনেই শেখার অংশীদার হন।
শিক্ষক বলবেন, শিক্ষার্থী প্রশ্ন করবে। শিক্ষক প্রশ্ন করবেন, শিক্ষার্থী যুক্তি দেবে। কেউ ভুল করলে অন্যরা তা নিয়ে ভাববে। বইয়ের জ্ঞান বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।
তবেই শ্রেণিকক্ষ হবে জ্ঞানচর্চার জায়গা, শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতিকেন্দ্র নয়।
শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার
বিশ্ব শিক্ষক দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন শিক্ষক একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম কারিগর।
তাই আমাদের প্রয়োজন এমন শিক্ষক, যাঁরা শিক্ষার্থীকে শুধু বলেন না কী ভাবতে হবে, বরং শেখান কীভাবে ভাবতে হবে।
এমন শিক্ষক, যাঁরা মুখস্থ উত্তর নয়, যুক্তি খোঁজেন।
এমন শিক্ষক, যাঁরা ভুলকে শাস্তি না দিয়ে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখেন।
এমন শিক্ষক, যাঁরা নম্বরের পাশাপাশি বিবেক, মানবিকতা ও সৃজনশীলতার মূল্য শেখান।
এমন শিক্ষক, যাঁদের একটি কথা শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় সাফল্য পরীক্ষার ফলাফলের তালিকায় লেখা থাকে না। তা লেখা থাকে তাঁর শিক্ষার্থীদের জীবনে।
বহু বছর পর কোনো শিক্ষার্থী যদি ফিরে এসে বলে—“স্যার, আপনার শেখানো একটি কথা আমি আজও ভুলিনি”—তাহলেই হয়তো একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার পাওয়া হয়ে যায়।
কারণ একজন সত্যিকারের শিক্ষক শুধু পাঠ শেষ করেন না; তিনি একটি চিন্তার শুরু করেন।
আর সেই চিন্তার আলোই একদিন একটি পরিবার, একটি সমাজ, এমনকি একটি দেশকে বদলে দিতে পারে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সকল শিক্ষককে শ্রদ্ধা।
শিক্ষা হোক মুখস্থের নয়—চিন্তার।
শিক্ষা হোক শুধু নম্বরের নয়—মানুষ হওয়ার।
জালাল উদ্দিন লস্কর
লেখক শিক্ষক ও সাংবাদিক
বাংলার খবর ডেস্ক : 



















