
পারভেজ হাসান, লাখাই প্রতিনিধি:
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা দৃষ্টিশক্তি হারানো যে জীবনের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে পারে না, তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা রুবেল মিয়া। জন্মগত চোখের সমস্যা এবং পরবর্তী সময়ে দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ হারানোর পরও হাল ছাড়েননি তিনি। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজের শ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন স্বাবলম্বী হওয়ার পথ।
১৯৯৯ সালে লাখাই উপজেলার বামৈ কাটিহারা পুরান বাজার এলাকার ইদ্রিস মিয়া ও ফরিদা আক্তার দম্পতির ঘরে জন্ম রুবেল মিয়ার। জন্ম থেকেই তাঁর চোখে কিছুটা সমস্যা ছিল। পরে ২০১২ সালে তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারান। তবে এই প্রতিবন্ধকতা তাঁকে কর্মজীবন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি।
২০১৮ সালে বন্ধু আলমগীরের সহযোগিতায় ফার্নিচারের দোকানে কাজ শুরু করেন রুবেল। টানা দুই বছর সেখানে ফার্নিচারের ঘষামাজা ও পালিশের কাজ শেখেন। এরপরও তিনি ফার্নিচারের কাজ চালিয়ে যান। পাশাপাশি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় ২০২০ সালে চাপাতির ব্যবসা শুরু করেন। একজন সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে জেলার বিভিন্ন বাজারে ঘুরে এ ব্যবসা পরিচালনা করতেন তিনি।
ব্যবসা থেকে অর্জিত লাভের টাকা দিয়ে একপর্যায়ে একটি গাড়িও কেনেন রুবেল। গাড়িটি চালানোর জন্য নিয়োগ দেন একজন চালক। তবে পর্যাপ্ত পুঁজির অভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধার মুখে পড়েন তিনি। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালু রাখার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য নিজের গাড়িটি বিক্রি করতে হয় তাঁকে।
তবে ব্যবসায়িক ক্ষতি তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। নতুন উদ্যমে ২০২৬ সালে কাগজের টোঙ্গা (ঠোঙা) তৈরি ও বিক্রির কাজ শুরু করেন তিনি। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে হাতে তৈরি করছেন কাগজের ঠোঙা। নিজে উৎপাদন করায় এ ব্যবসা থেকে কিছু বাড়তি লাভের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে রুবেল মিয়ার ‘হ্যাপি ট্রি হাউজ’ নামে একটি দোকান রয়েছে। ফার্নিচারের কাজের পাশাপাশি চাপাতি ও কাগজের ঠোঙার ব্যবসাও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। একাধিক কাজের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর পাশাপাশি নিজের ব্যবসাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।
সরকারি সহায়তায় ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রত্যাশা
ব্যবসা আরও বড় করার লক্ষ্যে সরকারি প্রণোদনা বা ঋণ সহায়তার জন্য আবেদন করেছেন রুবেল মিয়া। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে তাঁর উদ্যোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
রুবেল মিয়া বলেন, “সরকারি এই ঋণ বা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনাটি যদি আমি পাই, তবে আমার ব্যবসাটিকে আরও প্রসারিত করতে পারব। এর মাধ্যমে আমি যেমন পুরোপুরি স্বাবলম্বী হতে পারব, তেমনি আরও ৪-৫ জন বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারব।”
দৃষ্টিশক্তি হারানো, ব্যবসায়িক সংকট ও ঋণের চাপ—বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও রুবেল মিয়ার কাজ করে যাওয়ার চেষ্টা স্থানীয়ভাবে অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পেলে নিজের উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন এবং অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন।