
পারভেজ হাসান, লাখাই প্রতিনিধি:
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে হবিগঞ্জের লাখাইয়ে প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে প্রতিমার অবকাঠামো নির্মাণ, মাটির কাজ, রং করা ও সাজসজ্জার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কারিগরদের ব্যস্ততায় যেন দম ফেলার সময় নেই।
আগামী ১০ অক্টোবর শনিবার থেকে শুরু হবে শারদীয় দুর্গাপূজা। এ উপলক্ষে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। মণ্ডপগুলোতে প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি চলছে প্যান্ডেল নির্মাণ, আলোকসজ্জা ও অভ্যর্থনা গেট তৈরির কাজ। কোথাও প্রতিমার ফাটল মেরামত করা হচ্ছে, কোথাও মাটির শাড়ি ও অলংকার বসানো এবং রং-তুলির শেষ আঁচড় দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সী মানুষ মণ্ডপে ভিড় করছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ কারিগরদের নিপুণ হাতে প্রতিমা তৈরির কাজ উপভোগ করছেন।
লাখাই উপজেলার ৬ নম্বর বুল্লা ইউনিয়নের পূর্ববুল্লা গ্রামের প্রতিমাশিল্পী শিশু পাল (৩৮) বলেন, বংশপরম্পরায় তারা প্রতিমা তৈরির কাজ করে আসছেন। ছোটবেলা থেকেই পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে এ কাজ শিখেছেন তিনি। প্রতিমা তৈরি করে তার সংসার চলে।
শিশু পাল বলেন, “মা আমাকে দিয়ে এই কাজ করাচ্ছেন—এমনটা মনে করেই কাজ করি। এটা আমার আবেগের জায়গা। ভক্তদের মাঝে মাকে পরিপূর্ণভাবে নিয়ে আসাই আমার প্রধান কাজ। মায়ের প্রতিমা দেখে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা যেন মুগ্ধ হন, সে জন্য মনের মাধুরী দিয়ে প্রতিমা তৈরি করি।”
তিনি জানান, এবার তার বড় ছেলে পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির কাজে সহযোগিতা করছে। ইতোমধ্যে তিনটি প্রতিমায় রং করার কাজ শেষ হয়েছে। ষষ্ঠী পর্যন্ত প্রতিমা তৈরির কাজ চলবে। রং করার সময় মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড়ও বাড়ে বলে জানান তিনি।
শিশু পাল আরও জানান, এ বছর লাখাই ও মুড়াকড়ি গ্রামের কয়েকটি পূজামণ্ডপের প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন তিনি। তবে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার ভাষ্য, সুতা, দড়ি, পাট, বাঁশসহ প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন উপকরণের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু অনেক মণ্ডপ কমিটি আগের পারিশ্রমিকেই কাজ করাতে চান। ফলে খরচ বাদ দিয়ে লাভ খুব একটা থাকে না। তবুও বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছেন তিনি।
শিশু পাল বলেন, এবার ২০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন দামের প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। প্রায় এক মাস আগে থেকেই প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। এক কাঠামো, তিন কাঠামো ও পাঁচ কাঠামোর প্রতিমা তৈরি করা হয়। এ বছর তিন কাঠামোর প্রতিমার চাহিদা বেশি। বিশেষ করে মাটির শাড়ি পরানো প্রতিমার কাজ বেশি করছেন তিনি।
প্রতিমাশিল্পী জীবন পাল (৩০) বলেন, “ছোটবেলা থেকেই এই কাজ দেখে আসছি। প্রতিমা তৈরি করে আনন্দ পাই। ভক্তদের মাঝে মাকে নিয়ে আসতে পেরে মনে শান্তি পাই।”
এক সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্ত বলেন, প্রতিমা নির্মাণ শুধু একটি শিল্প নয়, এর সঙ্গে পারিবারিক ঐতিহ্য ও ভক্তি জড়িয়ে আছে। কারিগররা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতায় প্রতিমা তৈরি করে আসছেন। এবারও তারা মনোমুগ্ধকর প্রতিমা তৈরি করছেন। পূজার সময় এসব প্রতিমা ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করবে বলে আশা করছেন তিনি।