
স্টাফ রিপোর্টার:
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক স্নিগ্ধা রানী দাসের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ জাল হিসেবে শনাক্ত হওয়ার প্রায় পাঁচ বছর পরও বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি হয়নি। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) নিরীক্ষায় তার সনদ জাল হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পর এমপিও স্থগিত করা হলেও সরকারি কোষাগার থেকে গ্রহণ করা ১০ লাখ টাকার বেশি বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে তার চাকরি অবসানের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন না হওয়ায় পদটি শূন্য দেখানো যাচ্ছে না। এতে ওই পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ডিআইএর নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্নিগ্ধা রানী দাস ২০১২ সালে এমপিওভুক্ত হন। এরপর তিনি সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনের সময় ডিআইএর নিরীক্ষায় তার গ্রহণ করা বেতন-ভাতার পরিমাণ ১০ লাখ টাকার বেশি বলে উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে তার শিক্ষক নিবন্ধন সনদ যাচাই করা হলে সেটি জাল বলে শনাক্ত হয়। শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে যাচাই করে ডিআইএ দেখতে পায়, স্নিগ্ধা রানী দাসের দাখিল করা নিবন্ধন সনদ নম্বরের বিপরীতে প্রকৃত সনদধারী হিসেবে দেলোয়ার হোসাইন চৌধুরীর নাম রয়েছে। এ কারণে ওই সনদের ভিত্তিতে তার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ বিধিসম্মত হয়নি বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। স্নিগ্ধা রানী দাসের এমপিও ইনডেক্স নম্বর ১০৬৮৮৫৪।
জাল সনদ শনাক্ত হওয়ার পর তার এমপিও স্থগিত করা হলেও অবৈধভাবে গ্রহণ করা বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে চাকরি থেকে অব্যাহতি বা আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।
এদিকে পদটি এখনো শূন্য না হওয়ায় ওই পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএতে চাহিদা পাঠানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হারুনুর রশিদ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো শিক্ষকের পদ শূন্য হিসেবে গণ্য না হওয়ায় ওই পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে একজন শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন কার্যত আটকে থাকায় এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষা কার্যক্রমে।
জাল সনদধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা শাখা ২০২৩ সালের ১৮ মে একটি নির্দেশনা জারি করে। এতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৬৭৮ জন জাল সনদধারী শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও বন্ধ, বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে চাকরিচ্যুত করা, অবৈধভাবে গ্রহণ করা বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে ফৌজদারি মামলা করার ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
তবে ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের স্নিগ্ধা রানী দাসের ক্ষেত্রে ওই নির্দেশনার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হারুনুর রশিদ বলেন, “আমরা মামলা করার কোনো নির্দেশনা পাইনি। তাছাড়া মামলার খরচাপাতি কীভাবে মেটানো হবে, সে বিষয়েও আমাদের কোনো ধারণা নেই।” তিনি জানান, স্নিগ্ধা রানী দাসের পদটি এখনো শূন্য হয়নি। ফলে ওই পদের বিপরীতে এনটিআরসিএতে শিক্ষক চাহিদা পাঠানোর সুযোগও নেই।
প্রতিষ্ঠানটির অ্যাডহক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “আমি অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হয়েছি বেশিদিন হয়নি। সেভাবে বিষয়টি জানি না। তবে এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
জাল সনদ শনাক্ত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সরকারি অর্থ ফেরত, চাকরির বিষয়টি নিষ্পত্তি এবং পদটি শূন্য করে নতুন শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ তৈরি না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এখন সরকারি অর্থ আদায় ও শিক্ষার্থীদের পাঠদানের স্বার্থে বিষয়টির দ্রুত নিষ্পত্তি হবে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।