
মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি একটি বিদ্যালয় শুধু ইট-পাথরের ভবন নয়; একটি বিদ্যালয় গড়ে ওঠে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ভালোবাসা, স্মৃতি আর অগণিত গল্পে। দীর্ঘ কর্মজীবনে একজন শিক্ষক সেই গল্পেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন। দায়িত্ব পালন করতে করতে কখন যে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষার্থীর হৃদয়ে জায়গা করে নেন, তার হিসাব হয়তো রাখা যায় না। তবে বিদায়ের দিনে সেই ভালোবাসার কিছুটা যেন ফিরে আসে।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার চৌমুহনী ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কমলানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সেলিমা আক্তারের অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা ছিল তেমনই এক আবেগঘন আয়োজন। দীর্ঘ কর্মজীবনের ইতি টেনে অবসরে যাওয়া এই শিক্ষিকাকে বিদায় জানাতে শনিবার সকালে বিদ্যালয় মাঠে জড়ো হন সহকর্মী, অভিভাবক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ছিল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর স্মৃতিচারণের আবহ। একসময় যে বিদ্যালয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখর থাকতেন সেলিমা আক্তার, সেই প্রিয় কর্মস্থল থেকেই তাঁকে বিদায় জানাতে গিয়ে অনেকের কণ্ঠেই ফুটে ওঠে আবেগ।
বিদায় সংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নাজমা বেগম। সাংবাদিক হামিদুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন চৌমুহনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান সোহাগ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা রফিজ মিয়া, অবসরপ্রাপ্ত ওসি নুরুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার রুহুল আমিন শহীদ, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ইদ্রিছ খান মাস্টার, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব ফরিদুর রহমান, প্রধান শিক্ষক ইসকান্দর মীজা ফারুক, ফজলুল করিম এরশাদ, চৌমুহনী ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, সহকারী শিক্ষক সুলেমান মিয়া, আলমগীর হোসেন ও শাহিজুল ইসলাম।
এ ছাড়া অভিভাবক সদস্য আমিনুল ইসলাম ভুট্টু, সাংবাদিক চাঁদ সুলতানা চৌধুরী শাবানা, শাহআলমসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, একজন শিক্ষক কখনো শুধু পাঠ্যবই পড়ান না; তিনি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে শেখান, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা দেন। সেলিমা আক্তারও তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে দায়িত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেছেন। তাঁর নিষ্ঠা, আন্তরিকতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীলতার কথা স্মরণ করে বক্তারা তাঁর অবসরজীবনের সুখ, শান্তি ও সুস্বাস্থ্য কামনা করেন।
বিদায়ের মুহূর্তে সেলিমা আক্তারের কর্মজীবনের নানা স্মৃতি উঠে আসে বক্তাদের কথায়। সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পথচলা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাটানো অসংখ্য মুহূর্ত এবং বিদ্যালয়কে ঘিরে থাকা স্মৃতিগুলো যেন সেদিন নতুন করে ফিরে আসে।
একজন শিক্ষকের জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে—যে কর্মস্থল থেকে বিদায় নিচ্ছেন, সেখানকার মানুষগুলো ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করছে। সেলিমা আক্তারের বিদায় সংবর্ধনাও তাই ছিল আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বেশি কিছু; এটি ছিল দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসার প্রকাশ।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিদায়ী শিক্ষিকা সেলিমা আক্তারকে সম্মাননা ও উপহারসামগ্রী প্রদান করা হয়। এ সময় উপস্থিত সবার মাঝে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
কর্মজীবনের ব্যস্ত অধ্যায় শেষ হলেও একজন শিক্ষকের দেওয়া শিক্ষা ও ভালোবাসা কখনো অবসরে যায় না। শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে, সহকর্মীদের স্মৃতিতে এবং বিদ্যালয়ের ইতিহাসের পাতায় সেলিমা আক্তারের দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতিগুলোও থেকে যাবে দীর্ঘদিন।
বিদায় তাই এখানে শেষ নয়—এটি একটি দীর্ঘ সুন্দর পথচলার নতুন অধ্যায়ের শুরু।