

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান ছিল সামরিক নেতৃত্ব থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন। শুরুতে তিনি নিজেকে রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় না দিলেও পরবর্তী কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার সক্রিয়তা বাড়তে থাকে।
১৯৭৭ সালে তিনি ‘আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে’ ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নেতা ও পেশাজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুসংহত করার পাশাপাশি জিয়াউর রহমান বিভিন্ন মত ও রাজনৈতিক ধারার ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। এ প্রক্রিয়ায় ভাসানী-ন্যাপের নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়াসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’—জাগদল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমান সরাসরি সামনে না থাকলেও দলটি গঠনের পেছনে তার রাজনৈতিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে জাগদল প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় পরবর্তী সময়ে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীকে নিয়ে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ গঠিত হয়। ১৯৭৮ সালের ১ মে জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে এই রাজনৈতিক ফ্রন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। এর মাধ্যমে তিনি সরাসরি রাজনীতির মঞ্চে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন।
একই বছরের জুনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জিয়াউর রহমান বিপুল ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপর তার নেতৃত্বে একটি পৃথক রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া আরও জোরালো হয়।
বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন দলের নাম নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জাতীয়তাবাদী আদর্শকে দলের নামের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। শেষ পর্যন্ত ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ বা বিএনপি নামটি চূড়ান্ত করা হয়।
১৯৭৮ সালের ২৮ আগস্ট জাগদল বিলুপ্তির ঘোষণা আসে। এর কয়েকদিন পর ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান বিএনপির নাম, গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
দলটির গঠনতন্ত্র প্রণয়নের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের পাশাপাশি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম? [মূল সূত্রে উল্লেখিত ব্যক্তিদের তথ্য যাচাই প্রয়োজন]সহ কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্ট ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উঠে এসেছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে নাজমুল হুদা, মওদুদ আহমদ ও বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো ব্যক্তিদেরও সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
জিয়াউর রহমানের রাজনীতিতে প্রবেশ এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের ‘বিএনপি সময়-অসময়’ বইয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। বইটিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাকে বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দল গঠনের ধারার তুলনায় ভিন্ন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক ইতিহাসের এই অধ্যায় নিয়ে নানা মত ও বিতর্ক থাকলেও ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।