
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার খোজারগাঁও গ্রামে আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। হত্যা মামলার আসামিদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও মালামাল লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে বাদীপক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে আসামিপক্ষের জমি থেকে পাকা ধানসহ বিভিন্ন ফসল কেটে নেওয়া, গরু-ছাগল নিয়ে যাওয়া এবং পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগও করেছেন আসামিপক্ষের স্বজনরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর গ্রেপ্তার এড়াতে আসামিপক্ষের লোকজন নারী-শিশুসহ বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়ার সুযোগে এসব ঘটনা ঘটেছে। এতে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাহুবল উপজেলার ভাদেশ্বর ইউনিয়নের খোজারগাঁও গ্রামে নারীসংক্রান্ত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ৪ জুলাই সন্ধ্যায় প্রতিবেশীদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে আব্দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। এ ঘটনায় নিহতের ভাই আব্দুল কাদির বাদী হয়ে প্রতিবেশী হুছন আলীকে প্রধান আসামি করে ১২ জনের বিরুদ্ধে বাহুবল মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।
মামলা দায়েরের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে আব্দুল মালেক, বিল্লাল মিয়া ও মোস্তাকিম নামে তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করে। অন্য আসামিরা গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
আসামিপক্ষের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই বাদীপক্ষের লোকজন তাদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর শুরু করে। বাড়িতে কেউ না থাকায় একাধিক ঘরের দরজা-জানালা ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। ঘরে থাকা ধান-চাল, আসবাবপত্র, হাঁড়ি-পাতিলসহ প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।
এ ছাড়া গোয়ালঘর থেকে গরু-ছাগল এবং পুকুর থেকে মাছ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি জমিতে থাকা পাকা ধানও কেটে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন আসামিপক্ষের স্বজনরা।
আসামিপক্ষের স্বজনদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক—এ বিষয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে হত্যার ঘটনায় জড়িত নন এমন ব্যক্তিদের আসামি করা এবং মামলা কেন্দ্র করে বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
হত্যা মামলার প্রধান আসামি হুছন আলীর ছেলে উসমান আলী বলেন, ‘যিনি নিহত হয়েছেন, তিনি আমার চাচা। এভাবে একজন মানুষকে হত্যা করা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ঘটনা। আমরা প্রকৃত হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। তবে আমার বাবা ঘটনার সময় মিরপুর বাজারে ছিলেন। এরপরও তাকে হত্যা মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পরিবারের নারী ও শিশুরাও বাড়িতে থাকতে পারছে না। বাড়িঘরে ভাঙচুর করা হয়েছে। ঘরের মালামাল, গরু-ছাগল ও পুকুরের মাছ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জমির পাকা ধানও কেটে নেওয়া হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমরা প্রশাসনের কাছে এসব বন্ধ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই গ্রামটিতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মামলা ও পাল্টা অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ আরও তীব্র হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। যেকোনো সময় পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
এদিকে, হত্যা মামলায় নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে কি না, কিংবা আসামিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে ফসল কেটে নেওয়া, গবাদিপশু নিয়ে যাওয়া ও পুকুরের মাছ লুটের অভিযোগও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয়দের মতে, একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরবর্তী সহিংসতা ও প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করাও জরুরি। এ জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত, উভয় পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।