

জালাল উদ্দিন লস্কর,স্টাফ রিপোর্টার:
হবিগঞ্জের মাধবপুর পৌর এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব বেড়েছে। পৌরসভার প্রায় সব ওয়ার্ডেই দলবদ্ধভাবে এসব কুকুরের বিচরণ দেখা যাচ্ছে। রাস্তা, অলিগলি, বাজার, আবাসিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে কুকুরের অবাধ চলাচলে পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণে মাধবপুর পৌরসভার দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই। কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, গণটিকাদান কিংবা জলাতঙ্ক প্রতিরোধে নিয়মিত কোনো কর্মসূচিও চোখে পড়ছে না। ফলে কুকুরের কামড়ে মানুষ আহত হওয়ার পাশাপাশি জলাতঙ্কের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কুকুরের কামড়ে আহত ব্যক্তি চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় আসা রোগীদের এন্টি-রেবিস ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সবসময় ভ্যাকসিনের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকে না। ফলে কোনো কোনো রোগীকে বাইরে থেকে ভ্যাকসিন কিনতে হয় বলে জানা গেছে।
এদিকে মাধবপুরে কুকুরের কামড়ে আহত হওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটলেও এখন পর্যন্ত জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে চিকিৎসকদের মতে, কুকুরের কামড়কে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। আক্রান্ত প্রাণী জলাতঙ্কের জীবাণু বহন করলে দ্রুত চিকিৎসা না নিলে পরিস্থিতি মারাত্মক হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, মানুষের জলাতঙ্কের প্রায় ৯৯ শতাংশ সংক্রমণের জন্য কুকুর দায়ী। রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর জলাতঙ্ক প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী হলেও সময়মতো ক্ষত পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজনীয় পোস্ট-এক্সপোজার প্রফাইল্যাক্সিস (PEP) গ্রহণের মাধ্যমে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বেওয়ারিশ কুকুর নিধন করে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা কার্যকর পদ্ধতি নয়। এর পরিবর্তে ব্যাপকহারে কুকুরকে টিকার আওতায় আনা এবং মানবিক উপায়ে কুকুরের সংখ্যা ব্যবস্থাপনা করা কার্যকর কৌশল। কুকুরের অন্তত ৭০ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা গেলে জলাতঙ্কের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বাংলাদেশেও একসময় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে কুকুর নিধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও পরবর্তীতে কুকুরের গণটিকাদান কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ২০১১ সাল থেকে দেশে ব্যাপক কুকুর টিকাদান কর্মসূচি চালু হয় বলে জানা গেছে। এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে মানবদেহে জলাতঙ্কের সংক্রমণ কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাধবপুর পৌর এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন সড়কে দলবদ্ধভাবে কুকুরের চলাচল আরও বেশি দেখা যায়। অনেক সময় পথচারী, মোটরসাইকেল ও সাইকেল আরোহীদের পিছু নেয় কুকুরের দল। এতে কুকুরের কামড়ের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
শহরের বাসিন্দাদের দাবি, শুধু কুকুর নিধনের চিন্তা না করে পৌরসভা, উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সমন্বয়ে একটি কার্যকর কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা ও অবস্থান চিহ্নিত করে গণটিকাদান, প্রয়োজনীয় কুকুর ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেন সবসময় পর্যাপ্ত এন্টি-রেবিস ভ্যাকসিন মজুত থাকে, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এখনো মাধবপুরে জলাতঙ্কে মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও বেওয়ারিশ কুকুরের অবাধ বিচরণ ও নিয়মিত কামড়ের ঘটনা পরিস্থিতিকে যেকোনো সময় ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির অপেক্ষায় না থেকে আগেভাগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।