

জালাল উদ্দিন লস্কর, স্টাফ রিপোর্টার:
হবিগঞ্জের মাধবপুরে নিশান সোসাইটির সাবেক এরিয়া ম্যানেজার জামাল মিয়ার বিরুদ্ধে গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত হিসেবে নেওয়া বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অধিক মুনাফার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর একপর্যায়ে আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়া বন্ধ করে দেন তিনি। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন আমানতকারী।
স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর আগেও জামাল মিয়ার আর্থিক অবস্থা ছিল সাধারণ। মাধবপুর উপজেলার চৌমুহনী ইউনিয়নের সাহেবনগর এলাকায় তাঁর মাটির ঘর ছিল। তবে নিশান সোসাইটিতে চাকরির পর কয়েক বছরের মধ্যে তাঁর জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। পুরোনো ঘরের জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে বিলাসবহুল বাড়ি। জমি-জমাসহ তাঁর বিপুল সম্পদ রয়েছে বলেও স্থানীয়দের দাবি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিশান সোসাইটির এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গ্রাহকদের আস্থা ও পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে জামাল বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করেন। প্রথম দিকে কয়েক মাস নিয়মিত মুনাফা দেওয়ায় আমানতকারীদের মধ্যে তাঁর প্রতি আস্থা তৈরি হয়। পরে সেই আস্থার সুযোগ নিয়ে আরও বড় অঙ্কের টাকা সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মনির মিয়ার কাছ থেকে ৭ লাখ, সুমন মিয়ার কাছ থেকে ৮ লাখ, মীর হৃদয়ের কাছ থেকে ৫ লাখ, মোশাররফ হোসেনের কাছ থেকে ১৭ লাখ, পারভীন আক্তারের কাছ থেকে ৮ লাখ, জাহাঙ্গীর মিয়ার কাছ থেকে ১৪ লাখ, নার্গিস আক্তারের কাছ থেকে ১৩ লাখ, বাবু মিয়ার কাছ থেকে ৮ লাখ এবং আরেক মোশাররফ হোসেনের কাছ থেকে ১৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিজয়নগর উপজেলার মেঘশিমুল গ্রামের এমদাদ বলেন, জামাল তাঁর কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। পরে টাকা ফেরত না পেয়ে তিনি যোগাযোগের চেষ্টা করেও জামালের সঙ্গে কথা বলতে পারছেন না।
ভবানীপুর গ্রামের মোশাররফ হোসেনের অভিযোগ, জামালকে বিশ্বাস করে তিনি ২০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। বর্তমানে সেই টাকা ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না এবং জামালের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, জামাল প্রথম দিকে নিয়মিত মুনাফা দেওয়ায় তাঁরা তাঁর প্রতি আরও আস্থাশীল হয়ে পড়েন। পরে তাঁদের পরিচিত আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও টাকা সংগ্রহ করা হয়। একপর্যায়ে আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
জামালের সম্পদের উৎস নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, মাসিক প্রায় ২৫ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করেও কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। সাহেবনগরে মাটির ঘরের পরিবর্তে নির্মিত বাড়ি এবং জমি-জমাসহ অন্যান্য সম্পদের বিষয়ে তাঁরা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তবে স্থানীয়দের কথিত ২০ কোটি টাকার সম্পদের হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাঁর নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা জমি, বাড়ি, ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য সম্পদের নথিপত্র যাচাই করা হলে সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ ও উৎস সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
ভুক্তভোগীদের আরও দাবি, টাকা ফেরত চাওয়ার পর জামালের বিরুদ্ধে চেক প্রতারণাসহ বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেছেন। তবে এসব মামলার সংখ্যা, মামলা নম্বর, আদালতের আদেশ এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
জামালের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে জামালের স্ত্রী হাসিনা বেগম তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, কিছু মানুষ তাঁদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নানা অভিযোগ করছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ কোথায় গেছে, ওই অর্থ নিশান সোসাইটির হিসাবে জমা হয়েছিল কি না, জামাল বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে এবং এসব সম্পদের বৈধ উৎস কী—এসব বিষয় তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাঁরা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, আমানতের টাকা উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা এবং কোনো মামলায় আদালতের পরোয়ানা থাকলে তা আইন অনুযায়ী কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন।