

মোঃ আইয়ুব খান, মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি:
হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে কয়েকদিনের তীব্র গ্যাস সংকট কাটিয়ে শনিবার সকাল থেকে ধীরে ধীরে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা শিল্পকারখানাগুলোতে ফিরেছে স্বস্তি। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন নিয়ে উদ্বিগ্ন শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আশার সঞ্চার হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার বিকেল থেকে গ্যাস সরবরাহে মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিলে মাধবপুর উপজেলার ২৪টি ভারী শিল্পকারখানাসহ হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের প্রায় ৮১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে। অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ এতটাই কমে যায় যে উৎপাদন লাইন সচল রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে কয়েকদিন ধরে শিল্পাঞ্চলে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করে।
গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করতে না পারার আশঙ্কায় পড়ে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং শিল্প খাতের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল।
তেলিয়াপাড়ার ফার ইস্ট স্পিনিং মিলের জেনারেল ম্যানেজার সুমন আহমেদ জানান, শনিবার সকাল থেকেই তারা পূর্ণমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছেন। ফলে উৎপাদন কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক গতিতে শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিন আমরা চরম সংকটের মধ্যে ছিলাম। এখন গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হওয়ায় উৎপাদন পুনরায় শুরু করা সম্ভব হয়েছে।’
যমুনা শিল্পকারখানার জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী আবুল হোসেন বলেন, শনিবার সকাল থেকে ধীরে ধীরে গ্যাসের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক হচ্ছে এবং শ্রমিকরা নিয়মিত কাজে যোগ দিয়েছেন।
স্টার সিরামিকসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সৈয়দ শাহাদাৎ হোসেন জানান, সকাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। দুপুরের মধ্যে পূর্ণমাত্রার চাপ পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তারা। এতে উৎপাদন সক্ষমতা আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলে তিনি জানান।
শাহজীবাজার জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের (জেজিটিডিএসএল) ব্যবস্থাপক মো. খালেদ গণি বলেন, শনিবার সকাল ৮টা থেকে ছোট-বড় ৮১টি শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। বর্তমানে গ্যাসের চাপও সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
হবিগঞ্জ জেজিটিডিএসএলের আঞ্চলিক কার্যালয়ের জেনারেল ম্যানেজার মো. আলী আক্কাছ জানান, তাঁর অধীনস্থ ১৩টি শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান তিনি।
এর আগে গ্যাস সংকটের কারণে সায়হাম গ্রুপ, স্কয়ার ডেনিমস, স্কয়ার টেক্সটাইল, প্রাণ-আরএফএল, যমুনা গ্রুপ, স্টার সিরামিকস, আরএকে সিরামিকস, আকিজ গ্রুপ, বেঙ্গল, ম্যাটাডোর, তাফরিদ কটন ও ফার ইস্ট স্পিনিংসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত করতে বাধ্য হয়। অনেক কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রও বন্ধ হয়ে যায়, যা সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছিল। জাতীয় চাহিদা পূরণে সিলেট অঞ্চলের গ্যাস অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে।
তবে সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমেছে এবং হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কয়েকদিনের সংকটে শ্রমিকদের মধ্যে ছাঁটাই ও বেকারত্বের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় শিল্পাঞ্চলে আবার কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। উৎপাদন পুনরায় শুরু হওয়ায় উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, গ্যাস সরবরাহের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চল দ্রুত পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরে যাবে।