

আবু সায়েম মোহাম্মদ সা'-আদাত উল করীম:
জামালপুর শহরের চন্দ্রা এলাকার সরকারি হর্টিকালচার সেন্টারে একসময় উন্নত জাতের লিচুর চারা উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল প্রায় ৬০ বছরের পুরোনো মাতৃ লিচুবাগান। তবে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতায় সেই বাগান এখন প্রায় নিশ্চিহ্ন। সারি সারি শুকিয়ে যাওয়া গাছ, চারপাশে আগাছা আর জমে থাকা পানির চিহ্ন জানান দিচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়ের কথা।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য, সরেজমিন পরিদর্শন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে হর্টিকালচার সেন্টারের প্রায় ১০ একর এলাকা স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে রয়েছে। এতে বাগানের ১৩৯টি মাতৃ লিচুগাছের মধ্যে ১৩৭টি মারা গেছে। টিকে আছে মাত্র দুটি গাছ। একই সঙ্গে আম, ড্রাগনসহ অন্যান্য ফলের মাতৃবাগানও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
উদ্যানতত্ত্ব সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি মাতৃগাছ কেবল একটি গাছ নয়; উন্নত জাতের হাজারো চারা উৎপাদনের মূল উৎস। দীর্ঘ সময় ধরে পরিচর্যা ও সংরক্ষণের মাধ্যমে এসব গাছকে মাতৃগাছ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ফলে ১৩৭টি মাতৃ লিচুগাছের মৃত্যুতে উন্নত জাতের চারা উৎপাদন কার্যক্রম বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এতে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আয় কমার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ফল উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সমস্যাটি শুধু অতিবৃষ্টির কারণে তৈরি হয়নি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়েছে। ফলে বছরের পর বছর ধরে সরকারি হর্টিকালচার সেন্টারের বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে থাকছে।
চন্দ্রা এলাকার বাসিন্দা হারুন আহমেদ বলেন, এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে বেশি অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার ফল। পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বছরের পর বছর সরকারি সম্পদ নষ্ট হচ্ছে।
কৃষি উদ্যোক্তা লিটন বলেন, একটি মাতৃগাছ তৈরি হতে কয়েক দশক সময় লাগে। অথচ অবহেলার কারণে কয়েক বছরের মধ্যেই এসব গাছ ধ্বংস হয়ে গেছে। তার মতে, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে এত বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব ছিল।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, প্রতি বর্ষায় একইভাবে পানি জমে। সবাই সমস্যাটি জানলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ দেখা যায় না। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে হয়তো এত বড় ক্ষতি হতো না।
সরেজমিনে দেখা যায়, মারা যাওয়া গাছগুলো এখনও বাগানের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। নতুন মাতৃগাছ রোপণ কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত বাগান পুনর্বাসনের দৃশ্যমান উদ্যোগও চোখে পড়েনি। এতে সরকারি সম্পদ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ শাখাওয়াত ইকরাম বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে শুধু মাতৃ লিচুবাগান নয়, উৎপাদিত চারাও নষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
জামালপুর পৌরসভার প্রধান প্রকৌশলী মো. জহুরুল হক বলেন, মাস্টার ড্রেন না থাকায় পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে। আনসার ক্যাম্প থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত নির্মাণাধীন ড্রেনের কাজ শেষ হলে জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমবে। এ ছাড়া আরও তিনটি ড্রেন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।
তবে তিন বছরের বেশি সময় ধরে জলাবদ্ধতায় একের পর এক মাতৃগাছ মারা গেলেও কেন কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সে প্রশ্নের স্পষ্ট সমাধান এখনও মেলেনি। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মাতৃগাছ শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, উন্নত জাতের ফলের জিনগত ভাণ্ডারও। হারিয়ে যাওয়া এসব গাছের ক্ষতি পূরণ করতে নতুন করে মাতৃগাছ তৈরি ও উৎপাদন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতে পারে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, আরও কত সরকারি কৃষি সম্পদ নষ্ট হলে স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে? অবশিষ্ট দুটি মাতৃ লিচুগাছ এবং অন্যান্য ফলের মাতৃবাগানও কি একই পরিণতির দিকে যাবে, নাকি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে রক্ষা করা হবে—সেদিকেই তাকিয়ে স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা।