

পারভেজ হাসান, লাখাই প্রতিনিধি:
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় একই দিনে ছয়জনের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অ্যালকোহল বা বিষাক্ত তরল পান করেই তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনায় আরও একজন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তবে নিহতদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের কেউ হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ভেজাল বা বিষাক্ত অ্যালকোহল পানের কারণেই একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি তদন্তের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় নিহতরা হলেন—লাখাই উপজেলার মুড়াকড়ি গ্রামের সুজিত দাস (৩৬), সুদেব দাস (৬০), হবিগঞ্জ শহরের খোয়াই পাড়া এলাকার রণজিৎ কুরি (৪০), ভাদিকারা গ্রামের নন্দলাল (৫২) এবং তার স্ত্রী সুবি রবি দাস (৪০)। এ ছাড়া রাঢ়িশাল গ্রামে আরও এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মুড়াকড়ি গ্রামের বিপ্লব দাস (৩৪) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ জুলাই মুড়াকড়ি বাজারের একটি হোমিও ফার্মেসি থেকে কয়েকজন অ্যালকোহল সংগ্রহ করে পান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরই তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই রাতেই সুজিত দাস মারা যান। পরদিন তার দাহ সম্পন্ন হয়।
নিহত সুজিত দাসের স্ত্রী পঙ্কু রানী দাস বলেন, ‘কী যেন একটা খেয়েই তার এই পরিণতি হলো।’
একই ঘটনায় অসুস্থ হয়ে মারা যান সুজিতের বোনজামাতা রণজিৎ কুরি (৪০)। হবিগঞ্জ শহরের খোয়াই পাড়ায় নিজ বাড়িতে তার মরদেহের দাহ সম্পন্ন হয়। এরপর ৩০ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সুদেব দাস (৬০)। ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ দাহ করা হয়েছে।
নিহত সুদেব দাসের দুই মেয়ে অঞ্জু রানী দাস ও সঞ্জু রানী দাস বলেন, ‘বাবার নেশার অভ্যাস ছিল ঠিকই, কিন্তু এতদিন তো এমন হয়নি। হঠাৎ কী এমন ঘটে গেল? আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’
তাদের দাবি, সুদেব দাস ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুতে পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়েছে।
ঘটনার পর স্থানীয়দের নজর পড়েছে মুড়াকড়ি বাজারের কয়েকটি হোমিও ফার্মেসির দিকে। স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার পর ‘হ্যানিম্যান হোমিও হল’-এর মালিক ডা. সজল চক্রবর্তী চেম্বার বন্ধ রেখেছেন এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, নিহতদের কেউ কেউ ওই প্রতিষ্ঠান থেকে অ্যালকোহল কিনে থাকতে পারেন। সেখানে অ্যালকোহল বা মাদকজাতীয় ওষুধ বিক্রি হতো বলেও স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া কয়েক দিন আগে এক নারীর মৃত্যুর সঙ্গেও ওই চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের সম্পর্ক রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা চলছে। তবে এ দাবিরও কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিপ্লব দাসের স্বজন মুক্তা রানী ও রুবেল দাসের দাবি, কোনো ক্ষতিকর তরল পান করার কারণেই বিপ্লবের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে।
এদিকে ৩০ জুলাই ভাদিকারা হাই স্কুলের পেছনের এলাকায় নন্দলাল (৫২) বাংলা মদ পান করে মারা গেছেন বলে স্থানীয়ভাবে খবর ছড়ায়। তার স্ত্রী সুবি রবি দাস (৪০) স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং পরে স্ট্রোকে মারা যান বলে স্বজনদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে রাঢ়িশাল গ্রামের এক যুবক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচার রয়েছে। তবে স্থানীয়দের একাংশের দাবি, তিনিও অ্যালকোহল পান করেছিলেন। তার মৃত্যুর কারণও তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশি তৎপরতা শুরু হয়। লাখাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শরীফ আহমেদ বলেন, ‘আমরা খবর পাওয়ার আগেই দুজনের দাহ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে খবর পেয়ে পুলিশ পাঠিয়ে একজনের ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভাদিকারার নন্দলাল (৫২) নামের ব্যক্তির বিষাক্ত বাংলা মদ পানে মৃত্যুর বিষয়টিও আমরা শুনেছি। পুরো ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
একই দিনে একাধিক মৃত্যুর ঘটনায় মুড়াকড়ি ও আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃত্যুগুলোর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ঘটনার সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।