

আবদুর রউফ আশরাফ:
আষাঢ়-শ্রাবণের অবিরাম বর্ষণে রূপ বদলেছে গ্রামবাংলার প্রকৃতি। নদী-নালা, খাল-বিল এখন কানায় কানায় পূর্ণ। বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ তলিয়ে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন জলরাজ্য। বর্ষার থৈ থৈ ঢেউ, বাতাসে জেগে ওঠা ছোট ছোট তরঙ্গ আর জলরাশির বিস্তার যেন প্রকৃতির এক অনন্য শিল্পকর্ম। এই সৌন্দর্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার মানুষের আনন্দ, সংগ্রাম ও প্রতিদিনের টিকে থাকার গল্প।
বর্ষায় গ্রামের চিত্র যেন এক বিশাল জলরঙের ক্যানভাস। চারদিকে শুধু পানি, আর মাঝখানে দ্বীপের মতো জেগে থাকে ছোট ছোট গ্রাম। বাতাসের ছোঁয়ায় পানির বুকে যখন ঢেউ খেলে যায়, তখন মনে হয় যেন ক্ষুদ্র এক সমুদ্র। টিনের চালে ঝুম বৃষ্টির শব্দ, বিলজুড়ে সাদা শাপলার সৌন্দর্য আর সবুজের আবরণ বর্ষাকে করে তোলে আরও মোহনীয়।
এই মৌসুমে বদলে যায় গ্রামবাসীর জীবনযাত্রাও। পানিতে তলিয়ে যায় অনেক কাঁচা রাস্তা। হাঁটার পথের জায়গা নেয় নৌকা। ডিঙি নৌকাই হয়ে ওঠে মানুষের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। হাট-বাজার, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই ভরসা বৈঠা আর নৌকা।
বর্ষার নতুন পানিতে খাল-বিল ভরে ওঠে দেশীয় নানা প্রজাতির মাছে। ভোর থেকেই জাল, চাঁই কিংবা তাফা নিয়ে মাছ ধরতে নেমে পড়েন গ্রামের মানুষ। নতুন ধরা শোল, বোয়াল, টেংরা কিংবা অন্যান্য দেশীয় মাছ দিয়ে ঘরে ঘরে তৈরি হয় নানা পদের খাবার।
তবে বর্ষা শুধু সৌন্দর্যের নয়, কষ্টেরও প্রতীক। একটানা বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতায় দিনমজুরদের কাজ কমে যায়। অনেক কৃষক মাঠে নামতে পারেন না। টিনের ছাউনি চুইয়ে পানি পড়া, মাটির চুলায় রান্নার অসুবিধা, গবাদিপশুর খাদ্য সংকট এবং নদীভাঙনের আশঙ্কা গ্রামীণ জীবনে বাড়তি দুর্ভোগ সৃষ্টি করে।
বিলপাড়ের এক প্রবীণ কৃষকের ভাষায়, "বর্ষায় প্রকৃতি যেমন নতুন রূপে সাজে, তেমনি আমাদের জীবিকার পথ অনেক সময় বন্ধ হয়ে যায়। যারা দিনমজুরি করে সংসার চালায়, তাদের জন্য এ সময়টা সবচেয়ে কঠিন।"
তবুও প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে অভ্যস্ত গ্রামবাংলার মানুষ প্রতিকূলতাকে আপন করে নেয়। বর্ষার দিনে খিচুড়ির স্বাদ, বৃষ্টিভেজা বিকেল, নৌভ্রমণ আর মাছ ধরার আনন্দ তাদের জীবনকে অন্যরকম আবহে ভরিয়ে তোলে।
বর্ষার ঢেউ যেমন কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল—ঠিক তেমনি গ্রামবাংলার জীবনও সুখ-দুঃখের মিশেলে এগিয়ে চলে। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই মানুষ গড়ে তোলে বেঁচে থাকার নতুন গল্প। সেই গল্পই গ্রামবাংলার চিরন্তন জীবনগাথা।