
পারভেজ হাসান, লাখাই প্রতিনিধি:
বাংলার দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে এখন সোনালী ধানের সমারোহ। বৈশাখের তপ্ত রোদে মাঠজুড়ে পাকা ধান ঘরে তোলার ব্যস্ততা। তবে এই ব্যস্ততার ভিড়ে বদলে গেছে দৃশ্যপট। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির দাপটে এখন আর আগের মতো দেখা মেলে না সেই দলবেঁধে আসা কৃষিশ্রমিকদের দল। হারিয়ে গেছে একই রঙের গেঞ্জি পরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ধান কাটার সেই উৎসবমুখর দৃশ্য।
এক সময় বৈশাখ মাস আসার আগেই দেশের উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত কৃষিশ্রমিক দলবেঁধে আসতেন গ্রামাঞ্চলে। তাদের পরনে থাকত একই রঙের পোশাক বা গেঞ্জি, যা ছিল তাদের ঐক্যের প্রতীক। মাঠে সারি বেঁধে যখন তারা কাস্তে চালাতেন, তখন তাদের সমবেত গান আর হাসি-ঠাট্টায় মুখরিত হতো জনপদ। দুপুরের কড়া রোদে গাছের ছায়ায় বসে একসঙ্গে পান্তা খাওয়ার সেই দৃশ্যে ছিল এক অনন্য ভ্রাতৃত্বের ছাপ।
কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় মাঠে জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক ধান কাটার যন্ত্র ‘কম্বাইন হারভেস্টার’। যে কাজ করতে আগে এক দল শ্রমিকের কয়েকদিন সময় লাগত, যন্ত্রের সাহায্যে তা এখন অল্প সময়েই সম্পন্ন হচ্ছে। যান্ত্রিক এই পরিবর্তন কৃষকের সময় ও শ্রম বাঁচালেও ফিকে করে দিচ্ছে গ্রামবাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যকে।
গ্রামের প্রবীণরা আক্ষেপ করে বলেন, আগে ধান কাটার সময় পুরো গ্রাম উৎসবমুখর হয়ে উঠত। শ্রমিকদের আপ্যায়ন, তাদের সঙ্গে গল্প-আড্ডা—সব মিলিয়ে গ্রামে থাকত প্রাণের সঞ্চার। এখন সেখানে শোনা যায় শুধু যন্ত্রের শব্দ, হারিয়ে গেছে সেই প্রাণের মেলা।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, যান্ত্রিকীকরণ সময়ের দাবি এবং এটি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এর ফলে প্রান্তিক কৃষিশ্রমিকদের জীবিকায় প্রভাব পড়ছে এবং একইসঙ্গে সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দলবদ্ধ কাজের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই সময়ে এখন কেবল স্মৃতি হয়ে বেঁচে আছে গেঞ্জি পরা শ্রমিকদের সারিবদ্ধ ধান কাটার সেই দৃশ্য।