বাংলার খবর ডেস্ক
নীরব উপস্থিতি, নিঃশব্দ দায়িত্ব আর দীর্ঘ সহযাত্রার এক মানবিক অধ্যায়ের ইতি টানলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার জীবনের ছায়াসঙ্গী, গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমকে চিরবিদায় জানালেন তিনি। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন ফাতেমা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে উচ্চারিত হয় ক্ষমতা, আন্দোলন, কারাবাস ও সংঘাতের নাম, সেখানে আড়ালে থেকে যাওয়া কিছু নীরব মুখ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকে। খালেদা জিয়ার জীবনে সেই নীরব নামটি ছিল ফাতেমা বেগম। তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মী নন, কোনো দলের পদধারীও নন। তবু কঠিন সময়গুলোতে তার উপস্থিতি ছিল অবিচ্ছেদ্য।
দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে গৃহকর্মীর পরিচয়ের সীমা পেরিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন খালেদা জিয়ার একান্ত সঙ্গী। কারাগারের অন্ধকার দিন, গৃহবন্দিত্বের দীর্ঘ সময়, হাসপাতালের নিঃসঙ্গ রাত কিংবা বিদেশ সফরের নীরব করিডর—সবখানেই নিঃশব্দে পাশে ছিলেন ফাতেমা।
ফাতেমার জন্ম ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামে। বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা মালেকা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। অল্প বয়সেই সংসারের ভার এসে পড়ে তার কাঁধে। একই ইউনিয়নের কৃষক মো. হারুন লাহাড়ির সঙ্গে বিয়ের পর শুরু হয় নতুন জীবন। মেঘনা নদীর চরে কৃষিকাজ করে চলতো তাদের সংসার। তাদের ঘরে জন্ম নেয় মেয়ে জাকিয়া ইসলাম রিয়া ও ছেলে মো. রিফাত।
ছেলের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান তার স্বামী। মুহূর্তেই বদলে যায় ফাতেমার জীবন। দুই শিশু সন্তান নিয়ে তিনি ফিরে যান বাবার বাড়িতে। মুদি দোকানি বাবার সামান্য আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সন্তানদের গ্রামে রেখে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় পাড়ি জমান তিনি।
ঢাকায় এসে পূর্বপরিচিত একজনের মাধ্যমে কাজ পান খালেদা জিয়ার বাসভবনে। সেখান থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ সহযাত্রা। রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একজন নেত্রীর দৈনন্দিন জীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে ওঠেন ফাতেমা। বাথরুমে আনা–নেওয়া, ওষুধ খাওয়ানো, শারীরিক দুর্বলতায় হাত ধরে রাখা—এসব তার কাছে ছিল শুধু কাজ নয়, ছিল দায়িত্বের সম্পর্ক।
রাজনৈতিক উত্তাপের মাঝেও মানবিকতার যে দৃশ্যটি বহু মানুষের চোখে ভাসে, তা ফিরোজার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা খালেদা জিয়া ও তার হাত শক্ত করে ধরে থাকা ফাতেমার সেই মুহূর্ত। আবার কারাবাসের সময়ও আইনগত অনুমতিতে ফাতেমা প্রবেশ করেন কারাগারে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই স্বেচ্ছায় তিনি নিজেকে বন্দি করেন, কারণ তিনি জানতেন এই সময়ে একা থাকা মানে ভেঙে পড়া।
করোনাকালে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও ফাতেমা ছিলেন অবিচল। যখন মানুষ প্রিয়জনের কাছেও যেতে ভয় পাচ্ছিল, তখন তিনি সেবিকা হয়ে, সাহস হয়ে, ছায়া হয়ে পাশে ছিলেন। সর্বশেষ বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সময়ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিলেন এই নীরব সঙ্গী।
ফাতেমা বেগম প্রমাণ করে গেছেন, সব সম্পর্ক ক্ষমতার নয়। কিছু সম্পর্ক গড়ে ওঠে দায়িত্ব, সহানুভূতি আর মানবিকতার বন্ধনে। রাজনীতির কোলাহলের ভিড়ে তিনি এক নীরব নাম, আর সেই নীরবতাই তাকে ইতিহাসে আলাদা করে চিহ্নিত করে।